পরীক্ষার খাতায় ছেলেকে কম নম্বর দেওয়ার প্রতিবাদ করায় কক্সবাজারে বিদ্যালয় শিক্ষকদের মারধরের শিকার হয়েছেন এক অভিভাবক বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলার খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে রবিবার (৭ জানুয়ারি) এ ঘটনা ঘটে। নির্যাতিত অভিভাবকের নাম আয়াত উল্লাহ।
তিনি অভিযোগ করেছেন, বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে শিক্ষকরা রশি দিয়ে তার হাত-পা বেঁধে মাটিতে ফেলে নির্যাতন করেন। সেই নির্যাতনের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সোমবার বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় নির্যাতনের শিকার ওই অভিভাবকের।
নির্যাতনের শিকার আয়াত উল্লাহ অভিযোগ করেন, ‘খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত শিবিরের কর্মকাণ্ড চলে আসছিল। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে আসছিলাম আমিসহ এলাকার সাধারণ মানুষ। সর্বশেষ গতকাল রবিবার পরীক্ষায় আমার ছেলেকে কম নম্বর দেওয়ার বিষয়টি জানতে চেয়ে বিদ্যালয়ে গেলে রেগে যান খরুলিয়া কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বোরহান উদ্দিন।আমাকে অফিস রুমে আটকে রেখে পাশের খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল হককে ডেকে এনে কৌশলে আমাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেন তিনি।একইভাবে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং শিক্ষার্থীদের ডেকে এনে রোষানলে ফেলে আমাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। ওই শিক্ষকরা আমার হাত ও পা রশি দিয়ে বেঁধে মাটিতে ফেলে ব্যাপক নির্যাতন চালায় এবং নির্যাতনের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করে। এরপর সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।’
আয়াত উল্লাহ আরও বলেন, ‘ওই স্কুলের শিক্ষার্থী আমার ছোট ছেলে শাহরিয়ার নাফিজ (৮) আমাকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। তারা আমার ছেলেকেও ছুড়ে ফেলে দেয়। এ সময় ছেলেটি কোনও রকমে পালিয়ে বাড়িতে চলে আসে। পরে স্থানীয়রা এসে আমাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে পুনরায় তারা হামলা চালায় এবং আমাকে মারধর করে।’
নির্যাতনের শিকার এই অভিভাবক আরও বলেন, ‘খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল হক, খরুলিয়া কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বোরহান উদ্দিন এবং ওই বিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা কমিটির সভাপতি এনামুল হক চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ কারণে বিদ্যালয় চলাকালীন তারা বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের একাধিক সভা করেছেন। শুরু থেকে আমি এসব কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে আসছিলাম। এ কারণে তারা আমাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা নেয়। এ ব্যাপারে আমি কক্সবাজার সদর থানায় মামলা করবো।’
খরুলিয়া কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘অভিভাবক আয়াত উল্লাহর ছেলে আমার বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছেলে পরীক্ষার ফলাফল খারাপ করায় ওইদিন তিনি আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে বিদ্যালয়ে অফিসে এসে আমার শার্টের কলার ধরে টানাটানি শুরু করেন। খবর পেয়ে পাশে অবস্থিত খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল হকসহ বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকরা এসে আমাকে উদ্ধার করেন। এ সময় আয়াত উল্লাহ খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ওপর চড়াও হন এবং তার নাকে ঘুষি মারেন। এই অবস্থা দেখে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাকে মারধর করে। আমরা ওই অভিভাবককে মারধর করিনি এবং রশি দিয়ে বেঁধে রাখিনি।’
খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল হক বলেন, ‘অভিভাবক আয়াত উল্লাহর হামলায় আমি আহত হয়েছি। আমরা তাকে মারধর করিনি। অবশ্য শিক্ষার্থীরা রশি দিয়ে তাকে বেঁধেছিল মাত্র।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনোদিন জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে জড়িত নই, ছিলামও না। এটি আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’
খরুলিয়া কেজি অ্যান্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুল ও খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি এনামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। আমরা ভাবতে পারিনি এই ঘটনা এত বড় হবে। শিক্ষার্থীরা ভুল করে এই কাজ করেছে। আমরা উভয়পক্ষ বসে সমাধানের পথে যাচ্ছি। যারা দোষী হবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ভিকটিম আপনার বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছেন জানতে চাইলে এনামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনা যখন ঘটে গেছে এখন আমি কেন,বিদ্যালয়ের সবার প্রতি অভিযোগ করতে পারেন।’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কক্সবাজার জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবরী বলেন, ‘আমরা এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি। জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষকরা যে এত পাষণ্ড হতে পারে তা আগে জানতাম না।’
খবর পেয়ে সরেজমিনে যান কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যযুগীয় কায়দায় শিক্ষকরা একজন অভিভাবককে রশি দিয়ে মারধর করার বিষয়টি জেনে সরেজমিন এসেছি। আমি নির্যাতনের শিকার আয়াত উল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছি। বিষয়টি জেলা প্রশাসক এবং শিক্ষা কর্মকর্তারা জানেন। যদি নির্যাতনের শিকার আয়াত উল্লাহ আইনি সহযোগিতা চান আমরা তা করবো। এছাড়াও জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, রবিবার কক্সবাজার শহরের অদূরে ঝিলংজা এলাকার খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মিলে অভিভাবক আয়াত উল্লাহকে রশি দিয়ে বেঁধে ব্যাপক মারধর এবং সেই নির্যাতনের ঘটনা ভিডিও করে খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়। পরে তা ফেসবুক ও ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।








