চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়কুণ্ড এলাকায় রেলওয়ের ইজারা দেওয়া ১ দশমিক ৬৪ একর জায়গা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে দুই শীর্ষ শিল্প গ্রুপ। দেশের অন্যতম রড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কবির স্টিল রি-রোলিং মিল (কেএসআরএম) দাবি করেছে জায়গাটি তারা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছে। অন্যদিকে পিএইচপি গ্রুপও একই দাবি করছে।
জানা যায়, বিরোধপূর্ণ এই জায়গাটির পাশে পিএইচপির ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে। সামান্য দূরে কেএসআরএম রি-রোলিং মিল অবস্থিত। গত ১৩ মার্চ ওই জায়গায় কেএসআরএম বেড়া দিতে গেলে দুই গ্রুপ বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে কেএসআরএম গ্রুপের সিইও মেহেরুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০১৭ সালে ত্রি-পক্ষীয় শুনানির মাধ্যেমে কেএসআরএমকে জমিটি হস্তান্তর করে রেলওয়ে। কিন্তু জায়গাটি নিজেদের বলে দাবি করছে পিএইচপি, যা ভিত্তিহীন ও অসত্য। রেলের কৃষি লাইসেন্স গ্রহীতা নুরুল আলম অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন বাংলাদেশি নাগরিক। তিনি তিনশ’ টাকার স্ট্যাম্পে আদালতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে জায়গাটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করেন। আমাদের কাছে সকল কাগজপত্র আছে।’
তিনি বলেন, ‘জায়গাটি নিয়ে রেলওয়ে থেকে ১০ এপ্রিল আমাদের একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতেও জায়গাটির ইজারাদার হিসেবে আমাদের নাম উল্লেখ আছে। কেএসআরএম জায়গাটির ইজারাদার বলেই তো রেলওয়ে আমাদের চিঠিটি পাঠিয়েছেন। রেলওয়ে অবশ্যই প্রকৃত মালিকের কাছে চিঠিটি পাঠিয়েছেন। আমাদের কাছে রেলওয়ের চিঠি পাঠানোই প্রমাণ করে- জায়গাটির প্রকৃত ইজারাদার কেএসআরএম। তাই পিএইচপি জায়গাটির ইজারাদার হিসেবে যে দাবি করছে তার কোন ভিত্তি নেই।’
এদিকে পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের হেড অব এইচআর অভিজিৎ চক্রবর্তী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১ দশমিক ৬৪ একর জায়গাটি ২০০৫ সালে নুরুল আলমের কাছ থেকে আমরা সাফ-কবলা মূলে কিনে নিয়েছি। ওই সময় নুরুল আলম আমাদের না-দাবি দিয়েছিলেন, আমরা জায়গাটি আমাদের নামে নামজারিও করেছি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমরা ওই জমির খাজনাও পরিশোধ করেছি। অথচ এখন জায়গাটি কেএসআরএম নিজেদের বলে দাবি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিরোধপূর্ণ ওই ১ দশমিক ৬৪ একর জায়গার পাশে আমাদের ১ দশমিক ১৯ একর একটি জায়গা আছে। যেটা আমরা তিনটি আলাদা লিজের মাধ্যমে রেলওয়ে থেকে ইজারা নিয়েছি। কেএসআরএম শুধু ওই ১ দশমিক ৬৪ একর জায়গা দখল করেনি, তারা পাশে থাকা আমাদের ১ দশমিক ১৯ একর জায়গাতেও তারকাঁটার বেড়া দিয়েছে। যেটা তারা কোনভাবে করতে পারে না।’
অন্যদিকে রেলওলে সূত্রে জানা যায়, বিরোধপূর্ণ এই জাগয়াটি নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের স্টেট শাখার প্রধানের অফিসে ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ ত্রিপক্ষীয় একটি শুনানি হয়। শুনানিতে জায়গাটি কেএসআরএমকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওই ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে পিএইচপি ফ্যামেলির ইকবাল হোসেন চৌধুরীর পক্ষে আমির হোসাইন, কেএসআরএম গ্রুপের সেলিম উদ্দিনের পক্ষে আবু তাহের ও রেলওয়ের লাইসেন্সপ্রাপ্ত নুরুল আলমসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
রেলওয়ে পূর্ব অঞ্চলের চিফ এস্টেট অফিসার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জায়গাটি নিয়ে বিরোধ হওয়ার কোনও অবকাশই নেই। জায়গাটি নুরুল আলমসহ চার জনের নামে কৃষি লাইসেন্সের ভিত্তিতে ইজারা দেওয়া হয়। পরে তারা এটি কেএসআরএম-এর কাছে হস্তান্তর করলে গত বছরের ২৭ মার্চ ত্রিপক্ষীয় একটি শুনানিতে জায়গাটির ইজারা কেএসআরএমকে দেওয়া হয়। কেএসআরএম জায়গাটি দখলে নিতে যাওয়ায় এখন ঝামেলা শুরু হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই এলাকায় পিএইচপির কাছেও আমাদের জায়গা আছে। পিএইচপিকে ১ দশমিক ১৯ একর জায়গা ইজারা দেওয়া হয়েছে। আর কেএসআরএমকে ১ দশমিক ৬৪ একর জায়গা ইজারা দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৩ মার্চ কেএসআরএম ওই জায়গায় খুঁটি গেড়ে বেড়া দেয়। ওইদিন সকালে বেড়া দিয়ে যাওয়ার পর পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রি থেকে শ্রমিকরা গিয়ে ওই বেড়া ভেঙে দেন। পরে এ নিয়ে দুই পক্ষ বিবাদে জড়ান। ওই ঘটনার পর ১৪ মার্চ চট্টগ্রাম চেম্বারের এক নেতার মধ্যস্থতায় দুই পক্ষই চেম্বারে বসেন। কিন্তু তাতেও কোনও সমাধান হয়নি। এরপর গত ২৯ মার্চ কেএসআরএম-এর পক্ষ থেকে আবারও বেড়া দিতে গেলে দুই পক্ষ আবারও বিবাদে জড়ান। ওই দিন দুই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে ফের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুই পক্ষই সীতাকুণ্ড থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে এখনও দুই পক্ষ একে অপরের বিরোধিতা করছে।
দুই পক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থানের কারণে এ বিষয়ে সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে, রেলওয়ের কি.মি. নম্বর: ৩০/৩-৩০/৬ এর মধ্যে কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ লাইসেন্সমূলে ১ দশমিক ৬৪ একর রেলভূমির কৃষি লাইসেন্স গ্রহীতা হয়। এর দক্ষিণাংশে রেলওয়ের সেতু নং-৭১ এর পাশ ঘেঁষে পিএইচপির কর্তৃপক্ষের রাস্তার জায়গা আছে। এ যাতায়াতের রাস্তাসহ ১ দশমিক ৬৪ একর রেলভূমিতে কেএসআরএম কর্তৃপক্ষ রেললাইন হতে মাত্র ১৬ ফুট দূরত্বে ১০৮টি কংক্রিট খুঁটি বসিয়ে বিদ্যুতায়নসহ কাঁটাতারের সাহায্যে বেড়া দিয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরপর গত ৫ এপ্রিল রেলওয়ে থেকে কেএসআরএমকে একটি চিঠি পাঠানো হয়, চিঠিতে অনুমতি না নিয়ে ১ দশমিক ৬৪ একরের ওই জায়গায় কেন কংক্রিটের খুঁটি গেড়ে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি আগামী ১০ দিনের মধ্যে ওইসব খুঁটি ও বেড়া অপসারণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, আপনি (মো. সেলিম উদ্দিন) বাড়কুণ্ড এলাকার ১ দশমিক ৬৪ একর রেলওয়ে ভূমির কৃষি লাইসেন্স গ্রহীতা, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মেইন লাইন হতে মাত্র ১৬ ফুট দূরুত্বে ১০৮টি কংক্রিটের খুঁটি দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছেন, যা নিরাপদ ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। এমতাবস্থায় আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে উল্লেখিত কৃষি লাইসেন্সকৃত ভূমি হতে ১০৮টি খুঁটি সহ কাঁটাতারের বেড়া অপসারণ করে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি দফতরে জবাব দেবেন







