চট্টগ্রাম নগরীর সল্টগোলা ক্রসিং এলাকার নিজ বাসা থেকে গত ২৭ মে রূপালী ব্যাংক কর্মকর্তা সজল নন্দীর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত তা পুলিশি তদন্তে বের না হওয়া দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে। তাদের তদন্তে পরে জানা যায় সজল নন্দীর স্কুল পড়ুয়া ছেলের বন্ধুসহ তিন কিশোর এ ঘটনায় জড়িত। সাইকেল ক্রয়-বিক্রয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই তিন কিশোর তাকে হত্যা করে। গত কয়েক মাসে চট্টগ্রামে এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। যেগুলোর প্রায় প্রত্যেকটির সঙ্গে কিশোর অপরাধীরা জড়িত। পুলিশ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক সেবনের টাকা জোগাড় বা হিরোইজম দেখাতে গিয়েই কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
১ মে নগরীর পতেঙ্গা থানাধীন কর্ণফুলী নদীর ১৮ নম্বর ঘাট এলাকা থেকে স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আসামিদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পুলিশ আদনান মির্জা ও আসিফ মিজান নামে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। তারা দু’জনও কিশোর।
কিশোরদের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে আদনানের চাচা সোহেল মির্জা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিশোর বয়সে ছেলে-মেয়েরা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পছন্দ করে। আড্ডা দিতে গিয়েই অনেক সময় তারা বিপথে চলে যায়। কিশোর বয়সে অনেকে বাস্তবতা উপলব্ধি করতে না পারে, আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা তাদের দিয়ে অপরাধ সংগঠিত করে।’
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি নগরীর ষোলশহর এলাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে তিন মোটরসাইকেল আরোহী। এতে এক পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় জড়িতরাও সবাই কিশোর বয়সী ছিলেন।
এর আগে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি নগরীর জামালখান এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান ইসফারকে। এ ঘটনায় ৫ কিশোরকে আটক করা হয়েছে।
শুধু এসব ঘটনা নয়, সম্প্রতি চট্টগ্রামে চুরি, ছিনতাই, খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে কিশোর বয়সী ছেলে-মেয়েদের জড়ানোর প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। এমনকি পুলিশের ওপর গুলি ছুঁড়তেও পিছ পা হচ্ছে না এসব কিশোর অপরাধীরা।
এ সর্ম্পকে রেলওয়ে বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বেলাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে যারা স্থানীয় বড় ভাইদের সঙ্গে চলাফেরা করে তারাই বেশি অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। বড় ভাইদের সঙ্গে চলার কারণে তারা নিজেদেরকে সবচেয়ে ক্ষমতাধর মনে করে। এসময় তারা অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না।’
এ বিষয়ে নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েক মাসে যেসব মামলা নিয়ে আমরা কাজ করেছি তার অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গে ১৬-২০ বছর বয়সী কিশোর-তরুণরা জড়িত। মাদক সেবনের টাকা জোগাড় বা হিরোইজম দেখাতে গিয়ে কিশোর ছেলে-মেয়েরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা একটি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় এ-লেভেলের এক স্কুল ছাত্রকে ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তার বয়স মাত্র ১৭ বছর। জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পারি সে ইয়াবা সেবনের জন্য টাকা জোগাড় করতে মোটরসাইকেল চুরি ও চোরাই মোবাইল বেচা-কেনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তার আগে নগরীর দেওয়ান বাজার এলাকা থেকে আয়মান নামে ২০ বছর বয়সী তরুণকে গ্রেফতার করি। সে ওই এলাকায় চিহ্নিত ছিনতাইকারী। ইয়াবা সেবনের টাকা জোগাড় করতে সে এবং তার গ্যাং ছিনতাই করে।’ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংগঠিত শতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে সে জড়িত বলে তিনি জানান।
বাবা-মায়ের উদাসিনতা, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও মাদক আসক্তির কারণে কিশোর-তরুণরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। তবে ভিন্ন কথা বলেছেন সমাজ বিশ্লেষকরা। তারা কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার জন্য ভঙুর সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. ইন্দ্রজিৎ কুন্ড বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৬০ শতাংশ মানুষের বয়স ৪০ বছরের নিচে। আর ১৩-১৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। এই চার কোটির সামনে কোনও লক্ষ্য নেই, কোনও আদর্শ নেই। তারা কোনও ধরনের লক্ষ্য এবং আদর্শ ছাড়াই বেড়ে উঠছে। এ কারণেই সমাজে এখন কিশোর অপরাধ বাড়ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চার কোটি তরুণের মধ্যে ৭০ শতাংশ কম-বেশি পড়ালেখার সুযোগ পায়।কিন্তু যারা পড়ালেখা করছে তাদের সামনে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, সরকার কোনও আর্দশ রাখতে পারছে না। তাদের এইম ইন লাইফ নেই। তাদের সামনে কোনও আর্দশবান লোক নেই যে, কিশোররা লক্ষ্য স্থির করবে আমি বড় হয়ে তার মতো হবো।’
ইন্দ্রজিৎ কুন্ড বলেন, ‘কিশোররা অনুকরণ ও অনুসরণ করতে পছন্দ করে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে আমাদের সমাজে যারা বড় হচ্ছে অথবা যারা নিজেকে আর্দশবান দেখানোর চেষ্টা করছে তারা আসলে কোনও আর্দশবান লোক না। চুরি, লুটপাট, ধান্ধা, প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে তারা প্রচুর অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে গেছেন এবং তারাই সমাজের কাছে দাবি করছেন যে তারা আর্দশবান লোক। সমাজও তাদেরকে আর্দশবান লোক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে কিশোররা মনে করছে যেকোনও উপায়ে যদি আমি অর্থ বিত্তের মালিক হয়ে যেতে পারি তবে আমিও সমাজে আর্দশবান লোক হয়ে যাবো। এ কারণে কিশোররা অপরাধে জড়াতে দ্বিধাবোধ করছে না।’








