মা ইলিশ রক্ষা এবং ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতেই সোমবার (৭ অক্টোবর) থেকে কুড়িগ্রামসহ দেশের ৩৭ জেলার নদ-নদীতে ২২ দিনের জন্য সব ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই সময় জেলেদের সরকার থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। তবে কুড়িগ্রামের প্রায় ১৮ হাজার জেলের জন্য খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রথমবারের মতো ইলিশ জোন হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া কুড়িগ্রামের নদ-নদীতে মা ইলিশ শিকার বন্ধ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদের অববাহিকার কয়েকটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি ও জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাদ্য সহায়তা না দিয়েই নদীতে মাছ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তাই খাদ্য সহায়তা না দিয়ে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি ও জেলেরা।
জেলা প্রশাসকের ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের জেলেদের জন্য এখন পর্যন্ত কোনও বিশেষ বরাদ্দের (ভিজিএফ) নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হানিফা বলেন, ‘গত বছর এ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়েছে। সেজন্য এ বছরও আমার ইউনিয়নের জেলেরা ইলিশ শিকারের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। পেশাদার জেলেদের পাশাপাশি অপেশাদার জেলেরাও ইলিশ শিকারের জন্য জাল ও নৌকা প্রস্তুত করছে। এক সপ্তাহের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদে তারা ইলিশ ধরতে নামবে।’
জেলেদের খাদ্য সহায়তা না দিলে তারা কোনও নিষেধাজ্ঞা মানবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত বছর আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। এ অঞ্চলে জেলেরা হতদরিদ্র। একদিন নদীতে মাছ না ধরলে এদের খাবার জোটে না। ২২ দিন মাছ না ধরলে এরা খাবে কি? আপনি কিছুই দেবেন না আবার আশা করবেন তারা (জেলেরা) নদীতে জাল ফেলবে না, এমনটা বাস্তবে হয় না। তারা পেটের দায়ে নদীতে নামবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের এক জেলে বলেন, ‘সরকার যদি আমাদের খাবার জোগান না দিয়া জাল মারতে নিষেধ করে তাহলে আমরা বৌ-বাচ্চাগো কী খাওয়ামু? পেটের দায়ে আমাদের মাছ ধরাই লাগে। ২২ দিন না দেউক, সরকার যদি ১০/১২ দিনের খাবারও দিতো তাও আমরা জাল ফেলা বন্ধ রাইখা অন্য কাজ করে চালায় নিতে পারতাম। যদি কিছুই না দেয় তাইলে মাছ না ধইরা আমরা খামু কী?’
তিনি আরও জানান, ব্রহ্মপুত্রে ইলিশ ধরার জন্য পেশাদার জেলেদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক অপেশাদার জেলে নৌকা ও জাল নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন নদীতে শুধু ইলিশ আসার অপেক্ষা করছেন তারা।
চিলমারীর বাবলু নামে এক জেলে বলেন, ‘এখনও নদীতে মা ইলিশ আসা শুরু হয় নাই। ওদিকে (দক্ষিণাঞ্চল) ধরা বন্ধ হওয়ার ৪/৫ দিন পর আমাদের এখানকার নদ-নদীতে ইলিশ চলে আসে। তবে বর্তমানে জেলেদের জালে ছোট ছোট ইলিশ ধরা পড়ছে।’
২২ দিন জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ রাখবে কিনা জানতে চাইলে বাবলু বলেন, ‘অভিযান চললে হয়তো মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। কিন্তু রাতে বা অন্য সময় জেলেরা ইলিশ শিকার করবে।’
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমার ইউনিয়ন পুরোটাই ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত। এখানকার দুই শতাধিক জেলে পরিবারের সবাই হতদরিদ্র, মাছ ধরে এরা জীবিকা নির্বাহ করে। গত বছর হাজার নিষেধ করেও ইলিশ ধরা বন্ধ করতে পারি নাই। এবারও জেলেরা ইলিশ শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খাদ্য সহায়তা না দিলে এদের (জেলেদের) নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’
একই উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিদ্দিক আলী মণ্ডল বলেন, ‘এরা (জেলেরা) কোনও নিষেধই মানে না। আমার ইউনিয়নে প্রায় তিন শতাধিক জেলে পরিবার রয়েছে। জেলেরা যেভাবে ইলিশ শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে তাতে মনে হয় গত বছরের মতো এ বছরও ইলিশ ধরার মহোৎসব চলবে।’
সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে অবগত আছেন জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি জেলেদের এখন থেকে নদীতে জাল না ফেলতে বলছি। কিন্তু নতুন নতুন নৌকা প্রস্তুতি নিচ্ছে, কতজনকে থামাবো।’
কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলায় ১৭ হাজার ৬৪৩ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। গত বছর ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন জেলার কয়েকটি নদ-নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ায় এ বছর কুড়িগ্রাম জেলাকেও ইলিশ জোন হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে জেলার জেলেদের জন্য কোনও বিশেষ সহায়তা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে নদীতে অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও নৌযানের অভাবে জেলা মৎস্য বিভাগ সময়মতো অভিযান পরিচালনা করতে পারে না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, ‘ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোয় প্রচারণা চালিয়েছি। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল, পরিবহন খরচ এবং অভিযান পরিচালনার জন্য নৌযানের অভাবে নিষেধাজ্ঞাকালীন নদীতে পর্যাপ্ত অভিযান পরিচালনা সম্ভব হয় না। তারপরও আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তৎপর রয়েছি। ইলিশ রক্ষায় আমাদের যথাসম্ভব প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’
জেলেদের জন্য বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা না থাকার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘জেলেদের জন্য বিশেষ ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) বরাদ্দ চেয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ মৎস্য অধিদফতরে চাহিদা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত কোনও বরাদ্দ অনুমোদন না দেওয়ায় এই মুহূর্তে জেলেদের জন্য কোনও প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’








