নুসরাত হত্যা: বদলি হচ্ছেন এসপি, বরখাস্তের তালিকায় ওসি-এসআই

Send
ফেনী প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০৩:১১, মে ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:১১, মে ০৪, ২০১৯

নুসরাতমাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় অ্যাকশনে যাচ্ছে পুলিশ সদর দফতর। এরই মধ্যে এসপি জাহাঙ্গীর আলমকে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বরখাস্ত করা হচ্ছে সোনাগাজীর তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ও এসআই ইকবাল হোসেনকে।

এছাড়া এই ঘটনায় আরও দু’জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাফি হত্যার ঘটনায় ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) পিকেএম এনামুল করিমের গাফিলতির প্রমাণও মিলেছে। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দফতরের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদনসহ চিঠি পাঠানো হবে। পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এসব সুপারিশ পর্যালোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সূত্র জানায়, নুসরাত হত্যার ঘটনায় গাফিলতি খতিয়ে দেখতে ১৩ মে পুলিশ সদর দফতর ডিআইজি রুহুল আমিনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) রাতে কমিটি সদর দফতরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নুসরাত হত্যার ঘটনায় এসপি জাহাঙ্গীর আলম চরম মিথ্যাচার করেছেন। এমনকি রাফির গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে জেনেও তিনি গুরুত্ব দেননি। ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি। পুলিশ সদর দফতর থেকে হস্তক্ষেপ করা না হলে এসপি ঘটনাস্থলেই যেতেন না। ঘটনাটিকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। এটি জেনেও ওসির পক্ষেই অবস্থান নেন এসপি এসএম জাহাঙ্গীর আলম সরকার ।

নুসরাত হত্যায় পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত প্রতিবেদন এসপি সম্পর্কে বলা হয়েছে, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসপি জাহাঙ্গীর আলম চরম মিথ্যাচার করেছেন। তিনি তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৯টায় ঘটনা ঘটলেও তাকে শুরুতে জানানো হয়নি। খাগড়াছড়িতে তার একটি পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান ছিল। দুপুর সাড়ে ১২টার পর তিনি সেখানে রওনা দেন। রামগড় পার হওয়ার পর ঘটনাটি তাকে জানানো হয়। এরপর তিনি খাগড়াছড়িতে না গিয়ে ফেনীতে ফেরত আসেন।

তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার পরপরই সকাল ১০টার দিকে এসপিকে বিষয়টি জানায় স্থানীয় পুলিশ। ঘটনা জানার পরও প্রায় তিন ঘণ্টা তিনি ফেনীতে অবস্থান করেন। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফেনী থেকে সোনাগাজীতে যাওয়া যায়। কিন্তু রাফিকে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা শোনার পর এসপি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যাননি। খাগড়াছড়ির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুপুর ১টার দিকে তিনি ফেনী ছাড়েন।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, পুলিশ সদর দফতর হস্তক্ষেপ না করলে ঘটনার দিন এসপি ঘটনাস্থলেই যেতেন না। আগুনে জীবন্ত মানুষ পোড়ানোর মতো মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নাড়া দেয়নি।

পুলিশ সদর দফতর থেকে যখন এসপিকে ফোন করা হয়, তখন এসপি ছিলেন খাগড়াছড়ির পথে। তাকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে বিকাল ৫টার দিকে তিনি সোনাগাজীতে যান। অথচ কারও নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে এসপির উচিত ছিল সোনাগাজীতে ছুটে যাওয়া।

এদিকে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের সঙ্গে মিলে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর সব ধরনের চেষ্টা করেন। বিষয়টি মিডিয়াতে আসার কারণে অপচেষ্টা সফল হয়নি। প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবেই ঘটনা বিকৃত করে ওসি মোয়াজ্জেমের পক্ষে পুলিশ সদর দফতরে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন এসপি জাহাঙ্গীর আলম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের ডিআইজি পদমর্যদার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতর একমত হয়েছে। এসপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় যে ধরনের নির্দেশনা দেবে, পুলিশ সদর দফতর সে ব্যবস্থা নেবে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।’

সূত্র জানায়, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে এরই মধ্যে সদর দফতর এসপিকে কম গুরুত্বপূর্ণ এবং নন অপারেশনাল ইউনিটে বদলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ওসিকে বরখাস্ত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া অভিযুক্ত দুই এসআই মো. ইকবাল ও মো. ইউসুফকে বরখাস্ত করা হবে।

এডিসি এনামুলের গাফিলতি

পুলিশ সদর দফতরের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করার পর অধ্যক্ষের পক্ষে মানববন্ধন করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এমনকি মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটির সহসভাপতি ও সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন এতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। রাফির মা শিরিন আক্তার এবং রাফির ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান যৌন হয়রানির বিষয়টি মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি ও ফেনী জেলা এডিসি-রাজস্ব পিকেএম এনামুল করিমকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কোনও ধরনের ব্যবস্থা নেননি। উল্টো তাদের তিরস্কার করে বের করে দেন। এমনকি অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও তিনি কোনও ধরনের পদক্ষেপ নেননি। নুসরাত হত্যায় তার দায়িত্বে অবহেলা এবং গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে।

প্রসঙ্গত, ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম (এইচএসসি) পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে যান নুসরাত। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে ৪-৫ জন বোরকা পরিহিত ব্যক্তি শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে তার স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। পরে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত মারা যান।

/এআর/

লাইভ

টপ