বাইক নিয়ে শহীদ মিনার বেদিতে ছাত্রলীগ নেতা: তদন্তের মেয়াদ ফুরালেও প্রতিবেদন দেয়নি কমিটি

Send
রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০:২৫, অক্টোবর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৯, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের বেদিতে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বানি রবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বানি রবির বাইক চালানোর একমাস পেরিয়ে গেলেও এখনও ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়নি কমিটি। তদন্তের জন্য বেঁধে দেওয়া সময় পেরিয়ে গেলেও এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি কমিটির প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর হুমায়ুন কবির। আর প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, তদন্তের মেয়াদ শেষ হয়েছে কিনা তা একাডেমিক ক্যালেন্ডার দেখে জানাবেন তিনি। এদিকে, শহীদ মিনারের বেদিতে বাইক চালানোর ঘটনা তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে অভিযোগ করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, বর্তমান প্রশাসন নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলে দাবি করলেও গোলাম রাব্বানিকে রক্ষা করতেই তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর দিনগত রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে মোটরসাইকেল চালান ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বানি রবি। পরদিন বাংলা ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন এই ছাত্রলীগ নেতা। এ বিষয়ে গোলাম রব্বানি ওই দিন সংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বললেও রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে মোটরসাইকেল নিয়ে শহীদ মিনারের বেদিতে ওঠা যুবক তিনি নন বলে দাবি করেন।

বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথম দিকে চুপ থাকলেও ১২ সেপ্টেম্বর গোলাম রাব্বানি রবিকে শোকজ করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলে। জবাবে রবি বিষয়টি অস্বীকার করলে ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর হুমায়ুন কবিরকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে তদন্ত রিপোর্ট জমার দেওয়ার নিদিষ্ট সময় বেঁধে না দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। ১৫ কার্য দিবস শেষ হয়েছে গত ১৫ অক্টোবর; কিন্তু এখনও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি কমিটি।

এ নিয়ে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, কোনও এক অজানা কারণে বিষয়টি প্রথম থেকেই আড়াল করতে চাইছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যার জন্য তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করছে তারা। কেননা, আমার ওই সময় দেখেছি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে—যেখানে বলা হয়েছে, গোলাম রাব্বানি রবি শহীদ মিনার বেদিতে বাইক চালিয়েছেন। সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোলাম রাব্বানি রবি সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতা। তাই বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে বাঁচাতে তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও শহীদ মিনারে বাইক চালানো নিয়ে তারা নির্লিপ্ততার পরিচয় দিয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আদৌ ধারণ করে না; তারা চেতনা বিক্রি করে খায়।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বানি রবি

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সমন্বয়ক শাকিলা খাতুন বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ছাত্রলীগের যেকোনও ইস্যুতে বর্তমান প্রশাসন নমনীয়। এখানে যেহেতু শহীদ মিনারে বাইক চালানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ছাত্রলীগ নেতা, প্রশাসন তাকে রক্ষা করতেই তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করছে।’

ফোকলোর বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম কণক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত তাদের অবস্থান স্পষ্ট করা। শহীদ মিনার আমাদের অন্যরকম অনুভূতির জায়গা। প্রশাসনের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে জড়িতকে যত দ্রুত সম্ভব শাস্তির আওতায় আনা।’

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করেছি। কিন্তু ক্যাম্পাসে আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। তাই ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। আমরা প্রক্টর স্যারের কাছ থেকে আরও ১৫ কার্যদিবস সময় চেয়ে লিখিত আবেদন করেছি। তিনি সময় দিয়েছেন।’

কবে আবেদন করেছেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘১৫ কার্য দিবস শেষ হওয়ার পরপরই লিখিত আবেদন করে সময় নিয়েছি।’ তবে কবে ১৫ কার্যদিবস শেষ হয়েছে, তিনি নির্দিষ্ট করে তা বলতে পারেননি।

জানতে চাইলে প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমার কাছে কোনও লিখিত আবেদন করেনি কেউ। করলে আমি বিষয়টি জানতাম।’ এসময় প্রতিবেদকের সামনে অফিসের কর্মকর্তাদের ডেকে লিখিত আবেদন করেছেন কিনা জানতে চাইলে তারা জানান, কোনও লিখিত আবেদন জমা পড়েনি। কবে তদন্তের সময় শেষ হয়েছে, জানতে চাইলে অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমি একাডেমিক ক্যালেন্ডার না দেখে বলতে পারছি না।’

আরও পড়ুন–

শহীদ মিনারের বেদিতে মোটরসাইকেল চালালেন ছাত্রলীগ নেতা!

রাব্বানিই মোটরসাইকেল নিয়ে শহীদ মিনারের বেদিতে ওঠা সেই যুবক! 

/এমএ/

লাইভ

টপ