কর্মীদের গায়ে আঁচড় দিলে নারায়ণগঞ্জ অশান্ত হবে: শামীম ওসমান

Send
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০২:৩১, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:৩৬, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯




ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠানে শামীম ওসমাননারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের আসামি করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান। তিনি বলেছেন, আমি মনে করি এখানে আমাকে আসামি করা হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘এই মামলায় আমার কোনও কর্মীকে গ্রেফতার বা হয়রানি করা হলে নারায়ণগঞ্জ অশান্ত হয়ে উঠবে। নারায়ণগঞ্জে একঘণ্টাও কেউ আরামে ঘুমাতে পারবে না।’



শনিবার (৭ ডিসেম্বর) দুপুরে সদর উপজেলার লামারবাগ এলাকার নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল পার্কে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

হকার উচ্ছেদ ইস্যুতে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) মেয়র ডা.সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর হামলার ঘটনার দীর্ঘ ২২ মাস ১৮ দিন পর তাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ফাহমিদা খাতুনের আদালতে বুধবার (৪ ডিসেম্বর) বিকালে মামলাটি দায়ের করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তা জি এম এ সাত্তার। অভিযোগটি আমলে নিয়ে সদর মডেল থানাকে এজাহার হিসেবে গণ্য করার আদেশ দেন আদালত।

মামলা প্রসঙ্গে শামীম ওসমান আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছু বলতে পারছি না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থেকে যদি অন্য সরকার ক্ষমতায় থাকতো, তবে এই মামলার কারণে নারায়ণগঞ্জের রাজপথে চারা নাচতো।

ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল্লাহ বাদলের সভাপতিত্বে সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই, সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহিদ মো. বাদল, সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান বাচ্চু, যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল পারভেজ, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর সোহেল, মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি খোকন সাহান, সহ-সভাপতি বাবু চন্দন শীল, যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু প্রমুখ।

শামীম ওসমান বলেন, মামলার একজন আসামি হিসেবে প্রশাসনকে বলতে চাই তদন্ত করেন। যদি মনে হয় এমপিকে ধরতে অসুবিধা হচ্ছে, ধরা যায় না। তবে আমি এই মুহূর্ত থেকে দরকার হলে সংসদ সদস্যপদ ছেড়ে দেবো। কিন্তু তদন্ত করেন। আমার কারণেই যদি এ ঘটনা ঘটে থাকে তাও তদন্ত করেন, যদিও আমি আমার পার্টির সেক্রেটারির কথায় সেখানে গিয়েছিলাম।

তিনি প্রশাসনের উদ্দেশে বলেন, এখানে খেলবেন না। ধৈর্য ধরতে ধরতে, আর গালি শুনতে শুনতে খারাপ লাগে। কারা নায়ক আর কারা খলনায়ক সেটিও বের করতে হবে। খেলা যেহেতু দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে খেলা যদি খন্দকার মোশতাকের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তবে নারায়ণগঞ্জের মাটি দেখা যাবে না, শুধু মাথা দেখা যাবে। শামীম ওসমানের কর্মীর ওপর আঘাত করার পর কেউ যদি মনে করে নারায়ণগঞ্জ শান্ত থাকবে, তার চেয়ে বোকার রাজ্যে আর কেউ বাস করবে না। আমার কর্মীর গায়ে আচঁড় দিয়ে নারায়ণগঞ্জে কেউ একঘণ্টাও আরামে ঘুমাতে পারবে না। এটা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিলাম। আমার বক্তব্যটা হালকা করে নেবেন না।

গত নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করে শামীম ওসমান এমপি বলেন, নারায়ণগঞ্জের মনোনয়ন দিলাম কাকে? আমি তার নাম উচ্চারণ করতে চাই না। সামনে সময় আছে, দেখা হবে। আমি এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছি একজন আসামি হিসেবে। একটি মামলার আসামি আমি। মামলাটি কী? আমি যারে গোনায় ধরি না, সেরকম একটি মানুষের মামলা। কিসের মামলা, কে করলো মামলা, কেন করলো মামলা এই ব্যাখ্যাটা দিতে হবে। আমি মনেপ্রাণে চাই সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রীর দ্বারা দল পরিচালিত হবে না। দলের দ্বারা সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী পরিচালিত হবেন যেটি প্রধানমন্ত্রী চান। কারণ, দলের মূল শক্তি তৃণমূলের নেতাকর্মী।

তিনি বলেন, ২২ মাস ১৮ দিন আগে হকারদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছিল মেয়রের। আমি কোথাও শুনি নাই মেয়রদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষ হয়। সেই দিন ওই ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাদের কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না। ঘটনা জানতো না কেউই।

মামলার প্রধান আসামি নিয়াজুল প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, নিয়াজুল ওইদিন ওখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। নিয়াজুল কে? আওয়ামী লীগের একসময়ের তুখোড় নেতা এবং পরবর্তীতে পারিবারিক চাপের কারণে রাজনীতি থেকে মোটামুটি সরে গিয়েছিলেন সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার ফলে। কেন নিয়াজুলকে প্রধান আসামি করা হয়? নিয়াজুলের পরিচয় হচ্ছে নিয়াজুলের বড় ভাই নজরুল ইসলাম সুইট ২০০১ সালে ফ্যাসিস্ট খালেদা জিয়া যখন নারায়ণগঞ্জে আসে তখন একা দাঁড়িয়ে কালো পতাকা প্রদর্শন করেছিল। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কোর্ট থেকে তাকে রিমান্ড করা হয়েছিলো। সুইট রিমান্ডের আসামি হওয়ার পরেও রিমান্ডে থাকা অবস্থায় জেলখানা থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পরদিন নিয়াজুলের ভাই সুইটের লাশ আমরা রাস্তায় দেখতে পাই। ১৯৯৫ সালে নারায়ণগঞ্জকে যখন প্যালেস্টাইন বানিয়ে ফেলেছিলো বিএনপি নেতারা, তখন ১৫ দিনে ১২ জনকে হত্যা করা হয় তখনও প্রতিবাদী ছিল নিয়াজুল। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি ওই ঘটনার সময় নিয়াজুল রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম দেখে আসরের নামায পড়তে গাড়ি থেকে নেমে যায়। কেউ হামলা করতে গেলে একা যাওয়ার কথা নয়। রাজনীতি করা ছেলে নিয়াজুল যখন দেখেছে গরিব মানুষকে মারা হচ্ছে তখন সে প্রতিবাদ করেছিল এবং বলেছে মারছো কেন ভাই? মেরো না! এই কথা বলার অপরাধে নিয়াজুলের ওপর হামলা করা হয়েছে। সেই দিন অনেক আওয়ামী লীগ নেতা তাকে বাধা দিলেন। আইভীকে যদি হত্যার চেষ্টা করা হয় তবে আওয়ামী লীগ নেতা কাদির তো আইভীর বোনের জামাই। কাদিরের তো নিয়াজুলকে মারতে বাধা দেওয়ার কথা না। প্রথমে নিয়াজুলকে মেরেছে শিবিরের একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। নিয়াজুল হতচকিত হলো। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুবার প্রতিবাদ করলো। নিয়াজুলকে উপর্যুপুরি হামলা করলো। লাইসেন্স করা পিস্তল নিয়াজুল বের করলেও সে গুলি করে নাই। কিন্তু তার অস্ত্র ছিনতাই করা হলো। নিয়াজুল তখন অর্ধমৃত। সেময় জুয়েলসহ অনেকে তাকে উদ্ধার করতে দৌড়ে গেলো।

শামীম ওসমান দাবি করেন, ওইদিন মেয়রকে শিবিরের ক্যাডাররা ঘিরে রেখেছিল। এরপর নাটক করা হলো। বলা হলো, উনাকে (মেয়র আইভী) মারার চেষ্টা করা হয়েছে। হঠাৎ করে ২২ মাস পরে কেন লাফালাফি?

নারায়ণগঞ্জে একটি অডিও আপলোড করা হয়েছে জানিয়ে শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জে নাশকতা করতে তল্লায় গোপনে মিটিং করার সময় সেখান থেকে ১৭জনকে গ্রেফতার করা হলো। জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদের সবচেয়ে কাছের লোক মাইনুদ্দিনকে গ্রেফতার করা হলো। মাইনুদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের বক্তব্যে যা বলেছে তার অডিও লিকেজ হয়েছে। আমরা শুনতে পেয়েছি ও জানলাম কীভাবে নারায়ণগঞ্জে জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করা হয়েছে। সেখানে মাইনুদ্দিন বলেছে, মেয়র হচ্ছে আমাদের লোক। তাকে আওয়ামী লীগে রাখা হয়েছে, কারণ শামীম ওসমান থাকতে বিএনপি-জামায়াতকে মোকাবিলা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তাই তাকে (আইভী) আওয়ামী লীগে রাখা হয়েছে, যাতে শামীম ওসমানকে আঘাত করা যায়।

শামীম ওসমান বক্তৃতায় বলেন, বলা হলো মুজাহিদের সন্তানরা যখন কোথাও নাগরিকত্ব পাচ্ছে না, তখন মুজাহিদের বউ নারায়ণগঞ্জে ফোন করে এবং সেইদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে গোপনে সিটি করপোরেশন থেকে জন্মনিবন্ধন দেওয়া হয়। এসব কথা বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু আরেকটা কথা বলেছিল মাইনুদ্দিন। নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিল মুজাহিদ। সেখানে অস্ত্রের ট্রেনিং দেওয়া হতো। সেখানে জামায়াতের গোলাম আজমের বই পড়ানো হতো। মাইনুদ্দিন বললেন, নারায়ণগঞ্জে ১৯৭৫ সালের পরে আমার বাবা জেলে থাকার সময় আজ যিনি মামলা করেছেন তার পিতা আমার চাচা মরহুম আলী আহম্মদ চুনকা সাহেব ওই স্কুলের জন্য জমি বিক্রি করেন, যে জমির প্রকৃত মালিক ছিল আদমজী জুট মিল। সেটি দখল করে জামায়াতের কাছে বিক্রি করা হয়। আমি এটিকে অসম্ভব বলেছিলাম।
শামীম ওসমান এসময় কয়েকটি কাগজ উঁচিয়ে ধরে দেখিয়ে বলেন, এই দলিলের তারিখ ২১/১০/৭৬। বঙ্গবন্ধুর রক্তের দাগ তখনও শুকায় নাই সেসময় নিজেদের নিয়ে অনেক বড় কথা বলাদের পূর্বপুরুষরাই নারায়ণগঞ্জের এই জমি দখল করে মুজাহিদের হাতে মাত্র ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে তুলে দিয়েছিল। কে দিল? আমার শ্রদ্ধেয় চাচা এবং তৎকালীন এসডিওর মাধ্যমে। মাইনুদ্দিনের কথা যদি সত্য হয়, তাহলে সব বক্তব্যই সত্য হয়ে দাঁড়ায়। না হলে ২২ মাস পর মামলা কেন?

মামলা হওয়ার পর নেতাকর্মীরা উত্তেজিত জানিয়ে শামীম ওসমান বলেন, নেতাকর্মীদের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তারা আমাকে প্রস্তাব দিয়েছে, কিচ্ছু করতে হবে না, শুধু আপনি কয়েকদিনের জন্য দেশের বাইরে যান। নারায়ণগঞ্জের রাজপথ কার আমরা দেখাতে চাই। কিন্তু, আমি বলেছি, ধৈর্য ধরতে হবে। ১/১১ এর যারা খেলোয়াড়, তারা ঘন ঘন নারায়ণগঞ্জে আসে। নারায়ণগঞ্জ বদনাম হয় কোনও সময় র‌্যাবের কারণে, কোনও সময় বদনাম হয় করাপটেড অফিসারের কারণে, নারায়ণগঞ্জের মানুষের কারণে নারায়ণগঞ্জ বদনাম হয় না, বাইরের মানুষের কারণে হয়। তারাই বদনাম করে দিয়ে যায়।

সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে পূর্বের কমিটির সভাপতি এম সাইফুল্লাহ বাদল ও সেক্রেটারি এম শওকত আলীর নামই সভাপতি ও সেক্রেটারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

প্রসঙ্গত, মেয়র আইভীকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ঘটনার দিন অস্ত্র প্রদর্শনকারী নিয়াজুল ইসলাম খান (৫২), নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম (৪৯), সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল (৪৮), মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনু (৪৬), জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল হোসেন (৩৫), স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জানে আলম বিপ্লব (৪২), জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন (৩২), যুবলীগ কর্মী নাসির উদ্দিন ওরফে টুন্ডা নাসির (৫২), যুবলীগ নেতা চঞ্চল মাহমুদসহ (৫২) ৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত প্রায় ৯০০ থেকে ১০০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

 

/টিটি/টিএন/

লাইভ

টপ