নদীকে ধানি জমি দেখিয়ে দখল করে মাছ চাষ!

Send
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশিত : ১১:৫৯, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৭, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯

নদী দখল করে ঘের বানিয়ে মাছ চাষ হচ্ছেযশোরের ঝিকরগাছায় ভায়না নদীকে ধানি জমি দেখিয়ে ঘের বানিয়ে মাছ চাষের অভিযোগ পাওয়া গেছে প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়াত মেম্বার রশিদ ও তার জামাই লোকমান নদীকে ধানি জমি দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে ইজারা নেয়। এরপর সেখানে ঘের বানিয়ে গত ২০-২৫ বছর ধরে মাছ চাষ করছেন। স্থানীয়রা ঘেরে নামলে তাদের মারধরও করা হয়। নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করা হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা তাহের আলী মোল্যা (৭৫) বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা ভায়না নদীতে গোসল করেছি, সাঁতার কেটেছি, মাছ ধরেছি, পাট জাগ দিয়েছি। এখন দস্যুরা সেই নদী দখল করে নিয়েছে। ঘের বানিয়ে মাছ চাষ করছে। আমাদের নদীর পানি ব্যবহার করতে দেয় না। এখন পাট জাগ দিতে ২-৩ কিলোমিটার দূরে বাঁওড়ে যেতে হয়।’

গৃহবধূ রেবেকা খাতুন (৪৫) বলেন, ‘নদীতে হাঁসও নামতে দেয় না। গোসল করতে নামলে তারা মারধর করে। ২০ বছর আগেও আমরা এটিকে নদী হিসেবেই দেখেছি।’

বর্তমানে ভায়না নদীকে খণ্ড খণ্ড করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। ভায়না নদীর সঙ্গে শার্শা উপজেলার বেতনা নদীর সংযোগ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে বেতনা নদীর পানি বেড়ে ভায়না নদী দিয়ে বের হয়। কিন্তু নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করায় পানি নিষ্কাশনে বাধার কারণে জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি পোহাতে হয় স্থানীয়দের।

স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক জানান, ১৯৮৫ সালে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তাদের সাত জনের নামে নদী বরাদ্দ নেওয়া হয়। এক বছর পর তাদের দেওয়া বরাদ্দ জেলা প্রশাসকের দফতর থেকে নবায়ন করতে মেম্বার আব্দুর রশিদকে দায়িত্ব দেন। পরে রশিদ তাদের জানান, নদী আর তাদের নামে নেই। অন্য চার জন লিজ নিয়ে রশিদ মেম্বারের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রশিদ মেম্বার ও তার জামাই লোকমান কৌশলে নদী তাদের কাছ থেকে দখল করে নিয়েছেন।

নদী দখল করে ঘের বানিয়ে মাছ চাষ হচ্ছেগ্রামের বাসিন্দারা জানান, তারা রেজিস্ট্রি ও তহশিল অফিসে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন ঝিকরগাছা উপজেলার বারবাকপুর গ্রামের কোরবান আলী, শ্রীরামকাটি গ্রামের নূর মোহাম্মদ মণ্ডল ও দিদার বক্স মণ্ডল এবং কামারপাড়া গ্রামের আব্দুর রউফের নামে জাল কাগজ তৈরি করে হাল জরিপের সময় রেকর্ড এবং জালিয়াতির মাধ্যমে নদীকে ধানি খাস জমি দেখিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লোকমান হোসেন বলেন, ১৬ নম্বর রাধানগর মৌজায় ৫৪৮ দাগের ওই জমির মালিক নূর মোহাম্মদ, দিদার বক্স মণ্ডল, কুরবান আলী দফাদার ও আব্দুর রউফের কাছ থেকে জমি তিনি কিনেছেন। স্থানীয় একটি চক্র তাদের ক্রয়কৃত জমিতে করা মাছের ঘের দখলের পাঁয়তারা করছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই জমি নদীর নয়, ধানি জমি।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য তবিবর রহমান বলেন, ‘কী করে যেন রাধানগর গ্রামের সাবেক মেম্বার আব্দুর রশিদ ও তার জামাই লোকমান হোসেন নদী দখল করে বাঁধ দিয়ে পুকুর বানিয়ে ফেলেন। গ্রামবাসীর বাধায় তারা তাদের দখলে রাখতে পারেনি। পরে প্রভাবশালী লোকজনকে দিয়ে মাছ চাষ করাচ্ছেন তারা।’

দখলের প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয়রা শিমুলিয়া ইউনিয়নের তহশিল অফিসের নায়েব নেসার উদ্দিন আল আজাদ বলছেন, ‘লোকমান হোসেনের দাবি মিথ্যা। জালিয়াতি করে নদীকে ধানি জমি হিসেবে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। এসএ পর্চায় এটি নদী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আরএস পর্চায় রয়েছে ধানি জমি। সে হিসেবে কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে, তাতে ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে।’ দখলদারদের বিরুদ্ধে তিনি দেওয়ানি মামলা করবেন বলে জানান।

নদী পুনরুদ্ধারের দাবিতে এলাকার তিন শতাধিক বাসিন্দার সই করা অভিযোগপত্র জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দফতরে দিলেও কোনও ফল হয়নি।

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ জানান, নদী কখনও খাস জমি হিসেবে লিজ দেওয়া হয় না। বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য তিনি ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলবেন।

/এসটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X