‘ভুয়া’ ওয়ারেন্টে ৬৮ দিন হাজতবাস

Send
নাদিম হোসেন, সাভার
প্রকাশিত : ২২:২১, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৫৪, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০

 

আওলাদ হোসেনকে পাঠানো পাঁচটি ভুয়া ওয়ারেন্টের দুটির কপি। একই প্রতারকচক্র এগুলো পাঠিয়েছে বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবী।সাভারের আশুলিয়ায় একটি জমি দখলের জন্য আওলাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে পরপর ৫টি ভুয়া ওয়ারেন্ট পাঠিয়ে গ্রেফতার রেখে টানা ৬৮ দিন হাজতবাসে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উচ্চ আদালতে রিট করার পর মুক্তি পেয়েছেন তিনি। এরপর বিনা কারণে হাজত খাটানোর অভিযোগ তুলে জমির মালিকসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় পাল্টা মামলা করেছেন আওলাদ। মামলা নম্বর ৪০ (০২) ২০। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। ওই মামলায় সুমন নামে একজন আইনজীবী এবং আলমগীর নামে অপর এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী আওলাদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গত বছরের ৩০ অক্টোবর হঠাৎ তাকে আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের সময় জানানো হয় তার বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগে কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে ওয়ারেন্ট এসেছে। কক্সবাজারে না গিয়েও সেখানে কীভাবে নারী নির্যাতন বা মানবপাচার করেছেন এসব ভাবতে ভাবতেই হাজতে যেতে হয় তাকে।

আওলাদের স্ত্রী শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘আমার স্বামীকে ভুয়া ওয়ারেন্ট দিয়ে গ্রেফতার করে প্রথমে কক্সবাজারের একটি আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে আমি একজন অ্যাডভোকেটের সহায়তায় মামলার নথিপত্রে স্বামীর নাম খুঁজে পাইনি। পরে ওই মামলায় আমার স্বামী আওলাদকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।’

ভুক্তভোগী আওলাদ হোসেন। ৫টি ভুয়া ওয়ারেন্টে ৬৮ দিন হাজতবাস করতে হয়েছে তাকে।আওলাদ জানান, এ মামলায় ছাড়া পাওয়ার মুহূর্তে তার বিরুদ্ধে রাজশাহীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের নামে আরেকটি মামলার পরোয়ানা পাঠানো হয় পুলিশের কাছে। ফলে মুক্তি না দিয়ে তাকে রাজশাহীর আদালতে নিয়ে যায় কারা পুলিশ। সেখানে গিয়েও জানা যায় তার নামে কোনও মামলা নেই। ফলে রাজশাহীর আদালত থেকে মুক্তি পান তিনি। ঠিক সেদিনই বাগেরহাটের আদালত থেকে আরেকটি ওয়ারেন্ট আসে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে।

আওলাদ জানান, কারাগার থেকে মুক্তির আগেই তাকে জানানো হয়, এবার বাগেরহাটের একটি আদালত থেকে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার আরেকটি ওয়ারেন্ট এসেছে। তাকে বাগেরহাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই পরোয়ানাটিও ভুয়া। বিচারকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে এই মামলার পরোয়ানা প্রস্তুত করা হয়েছে। পরে এ মামলা থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে তৃতীয় দফায়ও তাকে কাবু করতে না পেরে মরিয়া হয়ে ওঠে তার প্রতিপক্ষ। এবার শেরপুর আদালতের একটি ফৌজদারি মামলায় তাকে গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠানো হয়। কারা কর্তৃপক্ষ এসব পরোয়ানা যাচাই না করে আবারও তাকে আটকে রাখে এবং শেরপুরে পাঠায়।

আওলাদ হোসেনকে গ্রেফতার করার জন্য আশুলিয়া থানায় ডাকযোগে পাঠানো একটি ভুয়া ওয়ারেন্ট।ভুক্তভোগী আওলাদ জানান, শেরপুরের আদালতের নামে তার বিরুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতারের সমন। এরপর আইনজীবীর পরামর্শে গত ৮ ডিসেম্বর তার স্ত্রী উচ্চ আদালতে হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরে একটি রিট করেন। আদালত ১০ ডিসেম্বর শুনানি শেষে রুল জারি করেন। এদিকে শেরপুরের মামলার ওয়ারেন্ট ভুয়া হওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে তারা উচ্চ আদালতে গেলেও প্রতিপক্ষ আবারও মরিয়া হয়ে ওঠে। এবার কারাগার থেকে মুক্তির আগেই ঢাকার এক মামলায় ফের তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তবে এবারও মামলার ওয়ারেন্ট ভুয়া ও স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা প্রমাণ হওয়ায় ৬ জানুয়ারি তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ৬৮ দিন হাজতবাস করার পর মুক্তি পান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশুলিয়ার বাইশমাইল এলাকায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ জমি নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে সাভারের জনৈক দানেশ ঢালীর সঙ্গে আওলাদের বিরোধ চলে আসছে। পাশের জমিটির মালিক হওয়ায় আওলাদের জমিটিও যেকোনও উপায়ে দখলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন সৌদি আরব প্রবাসী দানেশ ঢালী। এ ঘটনায় উভয়পক্ষ থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি এবং আদালতে মামলা করেন। আওলাদকে ওই জমি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য বিভিন্ন সময় হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

আওলাদ হোসেনের পক্ষে রিটকারী আইনজীবী ইমাদুল হক বলেন, চারবার ওয়ারেন্ট আসার পর সেগুলোর স্বাক্ষর একইরকম মনে হচ্ছিল। ভুক্তভোগীর পরিবারের একটা ধারণা ছিল, কিন্তু সেটা প্রমাণ করা যাচ্ছিল না। তবে সর্বশেষ অর্থাৎ পঞ্চম মামলাটি করেন দানেশের ভাগ্নে দেলোয়ার। আওলাদ হোসেনের নামে চাঁদাবাজির মামলা ছিল সেটি। ওই মামলায় জমি সংক্রান্ত বিষয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ করা হয়। এরপর আওলাদকে গ্রেফতারের জন্য ভুয়া ওয়ারেন্ট থানায় পাঠানো হয়। এই ওয়ারেন্টটি পাঠানোর পরই আগের ওয়ারেন্টের কপিগুলোর সঙ্গে স্বাক্ষর হুবহু মেলায় ধরা পড়ে যায় প্রতারক চক্রটি। দেখা যায়, বিভিন্ন আদালতের নকল সিলমোহর ব্যবহার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর জাল করে এসব ওয়ারেন্ট ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে।

আইনজীবী ইমাদুল হক আরও বলেন, ‘আওলাদ হোসেনের নামে কক্সবাজার, রাজশাহী, বাগেরহাট, শেরপুর ও ঢাকা জেলায় পাঁচটি ভুয়া ওয়ারেন্ট জারি করা হয়। একজন ব্যক্তিই এই পাঁচটি ভুয়া ওয়ারেন্টে স্বাক্ষর করেন। এগুলো অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের একজন বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে করা হয়। সাধারণত ওয়ারেন্ট জারির ক্ষেত্রে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে যে কেউ সংশ্লিষ্ট থানায় পৌঁছাতে পারেন। এ কারণে চক্রটি সহজেই এই জালিয়াতি করতে পেরেছে।’

আওলাদ বলেন,‘ সৌদি আরব প্রবাসী দানেশ ঢালী আমার জমি দখলের জন্য ছয় বছর ধরে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। আমি অনড় থাকায় দানেশ ঢালী ও তার কেয়ারটেকার আলমগীর অ্যাডভোকেট সুমনের মাধ্যমে ভুয়া ওয়ারেন্ট দিয়ে আমাকে গ্রেফতার করায়। এতে তার দুই ভাগ্নে দেলোয়ার ও জসিম এবং ভাড়াটিয়া ফরহাদ ও হানিফ সহযোগিতা করেন। এ জন্য আমি মামলা করেছি। মামলার আসামিরা হলেন—দানেশ ঢালী, কেয়ারটেকার আলমগীর, অ্যাডভোকেট সুমন, ভাগ্নে দেলোয়ার ও জসিম, বাড়ির ভাড়াটিয়া ফরহাদ, অরূপ রায় ও হানিফ।’

আওলাদ হোসেনকে পাঠানো আরেকটি ভুয়া ওয়ারেন্ট। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মামলার মূল আসামি দানেশ ঢালী অনেক বছর ধরেই সৌদি আরব প্রবাসী। তবে বছরের বিভিন্ন সময়ে তিনি দেশে আসেন। এবার যখন আওলাদ হোসেনকে একের পর এক ভুয়া ওয়ারেন্ট দিয়ে হাজতে আটকে রাখা হচ্ছিল তখন তিনি দেশেই ছিলেন। তবে আওলাদ মুক্তি পাওয়ার আগেভাগে দেশ ত্যাগ করেন তিনি।

জানা যায়, আসামিদের মধ্যে অরূপ রায় প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক। তিনি দানেশ ঢালীর সাভারের বাসায় ভাড়া থাকেন। মামলায় কেন অরূপ রায়ের নাম রাখা হলো এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওলাদ বলেন, ‘ঘটনাটি সিআইডি তদন্ত করছে। তাদের পরামর্শেই মামলা দায়ের করেছি। সিআইডি এ ব্যাপারে কারও কাছে কোনও মন্তব্য করতে নিষেধ করেছেন।’

আওলাদ হোসেন আরও বলেন, ‘বিনা অভিযোগে ভুয়া ওয়ারেন্ট জারি করে আমাকে ৬৮ দিন হাজতবাস করিয়েছেন আসামিরা। মামলায় সুমন ও আলমগীরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিনা অপরাধে আমাকে হাজতবাস করানোর ঘটনায় জড়িত সবার গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি।’

এ ঘটনায় আওলাদ হোসেনের যার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ, সেই দানেশ ঢালী বিদেশে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, প্রথম আলোর প্রতিবেদক অরূপ রায়ের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিজাউল হক দিপুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে তার দুটি ফোন নম্বরই বন্ধ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত ) জাবেদ মাসুদের কাছে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে উল্লেখ করে তিনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

পরে এ ব্যাপারে জানতে সিআইডির এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

/আইএ/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ
X