ইউপি চেয়ারম্যানের বাধায় পোশাক শ্রমিকের লাশ নদীতে, উদ্ধারের পর দাফন করলো পুলিশ

Send
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০:২১, মে ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০৫, মে ২৬, ২০২০

গ্রামে লাশ আনতে ইউপি চেয়ারম্যানের বাধা, নদীতে ফেলার পর আবার তুলে দাফন

ঢাকা থেকে ফেরার পথে মারা যাওয়া এক তরুণী পোশাক শ্রমিকের মরদেহ দাফন নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে লালমনিরহাটে। করোনায় মৃত্যু সন্দেহে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ওই মরদেহ এলাকায় এনে দাফনে বাধা দেয় বলে দাবি করেছেন মৃত তরুণীর বাবা। এই সুযোগে সহযোগিতার নাম করে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে সরকারি ব্যাগে ভরে মরদেহটি নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায় এক অ্যাম্বুলেন্স চালক। পরে সে মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করে কবরস্থানে দাফন করেছে পুলিশ। মৃতের বাবা, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, ওই পোশাক কর্মীর নাম মাহমুদা বেগম মৌসুমি (২১)। তার বাড়ি লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের উফারমারা গুচ্ছগ্রামে। দরিদ্র গোলাম মোস্তফা ও সাহেরা বেগম দম্পত্তির একমাত্র সন্তান ছিল সে। তারা এতটাই দরিদ্র ও ভূমিহীন যে একসময় ওই ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বর্মতল এলাকায় সরকারি রাস্তার ওপর বসবাস করতো। সেখান থেকে ২০১১ সালে উফারমারা গুচ্ছগ্রামে ঠাঁই হয় এই পরিবারের। 

তরুণীর বাবা গোলাম মোস্তফা জানান, কিছুদিন আগে তার মেয়ে মৌসুমি ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দেয়। আগে ভালোই ছিল। তবে কয়েকদিন থেকে নিজের শরীর খারাপ লাগার কথা বাড়িতে জানাচ্ছিল। পরে তাদের সঙ্গে কথা বলে গত ২১ মে বিকালে পরিচিত এক ট্রাকচালকের ট্রাকে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয় তার মেয়ে। কিন্তু, ওইদিন রাতেই ঢাকার আব্দুল্লাহপুর আসার পর তার মৃত্যু হয় বলে জানায় ট্রাকচালক। কীভাবে তার মেয়ে মারা গেছে নাকি সে অন্য কোনও ঘটনার শিকার হয়েছে তা এখনও তার অজানা।

গোলাম মোস্তফা আরও জানান, তার মেয়ের মৃত্যুর খবর স্থানীয় বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ নিশাতকে জানালে তিনি উল্টো ধমক দেন তাকে। সহযোগিতা না করে শাসিয়ে বলেন, ‘‘লাশ তো দূরের কথা, লাশের সাথে তুই যাবি না। তোকেও ওখানে পেট্রোল দিয়ে পুড়বো। আর যে অ্যাম্বুলেন্স যাবে, সে অ্যাম্বুলেন্স, আর ড্রাইভারসহ সবগুলাকে এক সাথে পেট্রোল দিয়ে পুড়বো।’ উপায় না পেয়ে আমি ওখানেই কান্দাকান্দি (কান্না) শুরু করি।’’

জেলার আদিতমারী থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান, মরদেহ নিয়ে বুড়িমারী যেতে বাধা পেয়ে পরদিন ২২ মে ৯৯৯ এ জানালে রংপুর তাজহাট থানা পুলিশ ওই ট্রাক জব্দ করে মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠায় এবং চালক ও সহকারীকে হেফাজতে নেয়।

রংপুর তাজহাট থানার এসআই মামুনুর রশীদ মোবাইলে বলেন, 'গত ২২ মে ৯৯৯ থেকে আমরা জানতে পারি যে, রংপুর ক্যাডেট কলেজের সামনের রাস্তায় ঢাকা মেট্রো -ট-২২-২৫৯৮ নম্বরের একটি ট্রাকে কেবিনে মাহমুদা বেগম মৌসুমি নামের (২১) বছর বয়সী এক গার্মেন্টকর্মীর মরদেহ আছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই গাড়িটি জব্দ করে চালক আজিজুল ইসলাম ও সহকারী চালক রতনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। ইফতারের আগ মুহূর্তে লাশ উদ্ধার করে রাতেই ময়নাতদন্ত শেষে ২৩ মে মরদেহ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। একইসঙ্গে ওই নারীর বাবা ট্রাকচালক ও সহকারীকে নিজের জিম্মায় নিয়ে যান।

তাজহাট থানার এসআই মামুনুর রশীদ আরও বলেন,  সুরতহাল প্রতিবেদনের সময় মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। করোনা পরীক্ষার জন্য মৃতের শরীর থেকে নমুনা নেওয়া হয়েছে। এ নমুনার প্রতিবেদন ও ভিসেরা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৌসুমির মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে। এর আগে মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ বলার সুযোগ নেই। 

এদিকে, আদিতমারী থানার ওসি সাইফুল ইসলাম জানান জানান, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকায় তিস্তা নদী থেকে গত ২৪ মে সরকারি ব্যাগে মোড়ানো অজ্ঞাত এক তরুণী গার্মেন্টকর্মীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আমরা পাটগ্রাম ও রংপুরের তাজহাট থানায় যোগাযোগ করি। এরপর পাটগ্রাম থানা পুলিশের সহায়তায় ওই নারীর পিতা গোলাম মোস্তফাকে নিয়ে এসে গলিত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ২৫ মে পুলিশের অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ পাটগ্রামে নিয়ে গিয়ে সেখানকার কেন্দ্রীয় কবরস্থান ভোলার ডাঙায় পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে দাফন করা হয়।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, পুলিশ যে মরদেহ উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে পরিবারের হাতে তুলে দিলো তা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলো কিভাবে?  এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মৃত মৌসুমির পিতা গোলাম মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'চেয়ারম্যানের হুমকির কারণে আমি কী করবো যখন ভেবে পাচ্ছিলাম না তখর রংপুরের একজন অ্যাম্বুলেন্সচালক এসে সহযোগিতা করার কথা বলে। যেহেতু লাশ বাড়িতে নেওয়া নিষেধ করেছে ইউপি চেয়ারম্যান তাই সে অন্য জায়গায় লাশ দাফনের কথা বলে আমার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেয় এবং আমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু, ওই ড্রাইভার লাশ দাফন না করে তিস্তা নদীতে আমার মেয়ের লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পরে আমি আদিতমারী থানায় গিয়ে মেয়ের লাশ শনাক্ত করি এবং ঘটনা খুলে বলি। পরে আদিতমারী ও পাটগ্রাম থানা পুলিশের সহায়তায় পাটগ্রামে লাশটি দাফন করা হয়। আমি বিচার চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি। আমি সুষ্ঠু বিচার চাই।'                                            

আদিতমারী থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, 'নিহতের বাবা একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন আদিতমারী থানায়। আমরা পুরো ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত তদন্ত করে দেখছি। অভিযোগের সত্যতা পেলে পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'                               

এলাকায় লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ নেওয়াজ নিশাত বলেন, 'অভিযোগ সঠিক নয়। আমি লাশ নিয়ে আসতে এবং দাফনে কোনও বাধা দেইনি। বরং মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করেছিলাম কিন্তু মেয়ের বাবা পরে আর আমার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেননি।'

তিনি নন, এলাকাবাসী বাধা দিতে পারে বলে দাবি করেন ওই চেয়ারম্যান।

লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা বলেন, ২৪ মে তারিখ বিকালে আদিতমারী থানা পুলিশ স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে তিস্তা নদী থেকে সরকারি ব্যাগে মোড়ানো অজ্ঞাত তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে। পরদিন ২৫ মে তারিখে মরদেহ শনাক্ত হলে পাটগ্রাম ও আদিতমারী থানা পুলিশ আমাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ পাটগ্রাম নিয়ে গিয়ে সেখানকার কেন্দ্রীয় কবরস্থান ভোলার ডাঙায় পরিবারের সদস্যদের এবং ওই উপজেলা চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে দাফন করা হয়েছে। এই ঘটনায় অভিযোগের বিষয়গুলো আমরা তদন্ত করে দেখছি।

জানতে চাইলে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, ঘটনাটি খতিয়ে দেখে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাতের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের জন্য পাঠানো হবে।

/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ