এক সময়ের নারায়ণগঞ্জের নামের সঙ্গে আদমজী জুট মিল ও কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টের পাটকলসহ পাট ব্যবসার ব্যাপক খ্যাতি ছিল। নারায়ণগঞ্জ শহর ও এর আশেপাশে শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা অনেক কারখানাতে কাজ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে লোকজন এসে ভিড় করতো। তবে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিল বন্ধ হওয়ার কয়েক বছরের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জে আরও অন্তত ১০টি পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। আর এ কারণে বেকার হয়ে গেছেন এসব পাটকলের কয়েক লাখ শ্রমিক ও এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষেরা। দীর্ঘদিন আন্দোলন সংগ্রাম করেও কোনও কূল কিনারা না পেয়ে এদের অনেকেই ফিরে গেছেন গ্রামে, অনেকেই পেশা বদলে যোগ দিয়েছেন অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে। পাওনা টাকাও পাননি এমন অভিযোগ রয়েছে অসংখ্য শ্রমিকের। তবুও এখনও এসব পাটকল আবার চালু হবে এমন আশায় দিন গুনছেন বেশিরভাগ শ্রমিক। তবে, এতোকিছুর পরেও নারায়ণগঞ্জ থেকে চলছে কাঁচাপাট রফতানি। সরকার কাঁচাপাট রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় শ্রমিকদের ভরসার স্থল হয়ে উঠেছে পাট রফতানির প্রেসহাউজগুলো।
আদমজী জুট মিলকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে গড়ে ওঠে আরও বেশ কিছু জুট মিল। যে কারণে নারায়ণগঞ্জ খ্যাতি লাভ করে প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে। অন্য জুট মিলগুলোর মধ্যে রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জে মনোয়ারা জুট মিল, সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত তাজ জুট প্যাকিং কোম্পানী, প্রাইম জুটেক্স, শীতলক্ষ্যার পূর্বতীরে সোনাকান্দার সারোয়ার জুট মিল, নবীগঞ্জে জামাল জুট মিল, উত্তর নদ্যার আমিন ব্রাদার্স জুট অ্যান্ড কোম্পানি, কাঁচপুর বাজার এলাকায় নওয়াব আব্দুল মালেক জুট মিল, আনোয়ার জুট মিল, এলাইড জুট মিল, মাসরিকী জুট মিল। তারাব এলাকায় নিশান জুট মিল, গাউছিয়া জুট মিল। এই পাটকলগুলো যেমন আদমজী জুট মিলের দেখাদেখি গড়ে উঠেছিল তেমনই বন্ধও হয়ে গেছে আদমজী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবেই। এগুলোর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে মনোয়ারা জুট মিল প্রায় ২০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে এর পরবর্তী সময়ে।
এদিকে, নারায়ণগঞ্জে বেসরকারি পর্যায়ে যে সব মিল চালু রয়েছে সেগুলোও ধুকছে নানা সমস্যায়।
এরপরও এই ডামাডোলের ভেতর এখনও টিকে আছে রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবোর টাটকী এলাকায় অবস্থিত নিউ ঢাকা জুট মিল, উত্তরা জুট মিল ও কাঞ্চনে নবারুন জুট মিল এবং বন্দরের মদনপুরে অবস্থিত সুরুজ জুট স্পিনিং নামে পাটের সুতা তৈরির একটি কারখানা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্ধ হওয়া পাটকল কারখানাগুলোর অবকাঠামোও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার যেগুলোর অবকাঠামো এখনও বর্তমান সেগুলোর বেশিরভাগেরই মেশিনারিজ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেকার শ্রমিকরা । এসব পাটকলের অবকাঠামো এখন ব্যবহৃত হচ্ছে গোডাউন হিসেবে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, পাকিস্তানের অন্যতম ধনাঢ্য আদমজী পরিবারের তিন ভাই এ. ওয়াহেদ আদমজী, জাকারিয়া আদমজী ও গুল মোহাম্মদ আদমজী যৌথভাবে আদমজী জুটমিল প্রতিষ্ঠা করেন। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার তীরে সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়ায় আদমজী জুটমিল গড়ে ওঠে ২৯৭ একর জমির ওপর। ১৭০০ হেসিয়ান ও ১০০০ সেকিং লুম দিয়ে এই মিলের উৎপাদন শুরু হয় ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর। ওই সময় এই মিলের উৎপাদন থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো। তখন মিলে তাঁতকল বসানো হয় ৩ হাজার ৩০০টি। আদমজী জুট মিলে উৎপাদিত চট, কার্পেটসহ বিভিন্ন প্রকার পাটজাত দ্রব্য দেশের চাহিদা পূরণ করে রফতানি হতো চীন, ভারত, কানাডা, আমেরিকা, থাইল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এ সময় আদমজী জুট মিল পরিচিত হয় পৃথিবীর অন্যতম জুটমিল এবং এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ কারখানা হিসেবে। আদমজীকে ঘিরে শীতলক্ষ্যার দুইপাড়ে সিদ্ধিরগঞ্জ, কাঁচপুর, বন্দর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে গড়ে ওঠে বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাস। মিল ছাড়াও এসব এলাকায় কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়।
জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আদমজী জুট মিলটি ১৯ বছরে লোকসান দেয় মাত্র ২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ১৯৭৪ সালের ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে আদমজী জুটমিল জাতীয়করণ করে জুটমিল করপোরেশনের হাতে ন্যস্ত করা হয়। এরপর থেকে অব্যাহতভাবে লোকসানে ছিল আদমজী জুটমিলটি। মিলটিতে ২৪ হাজার ৯১৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক চাকরি করতেন। মিলটি বন্ধ করার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের ৩৫ কোটি ৭৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। আদমজী জুটমিল বন্ধ করা হয় ২০০২ সালের ৩০ জুন। তবে এর অনেক আগেই ১৯৯৪ সালের দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের মনোয়ারা জুট মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৫ বছর আগের রিটের কারণে বেসরকারিকরণের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে মনোয়ারা জুট মিলকে।
সরকারের বন্ধ কলকারখানা চালুকরণ নীতিমালার আওতায় বন্ধ আদমজী জুটমিলের ২নং ইউনিটের স্থানে ৫০ তাঁত বিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক ডাইভারসিফাইড প্রোডাক্ট তৈরির মিল স্থাপন এবং মনোয়ারা জুট মিলকে টিস্যু পেপার মিলে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এদিকে রূপগঞ্জের কাঞ্চনের নবারূন জুট মিলটি বেসরকারিকরণ করার পর থেকে মিলটি চালু রয়েছে। তবে গত কিছুদিন ধরে মিলটিতে নানাবিধ সমস্যা চলছে।
পাট অধিদফতরের নারায়ণগঞ্জস্থ সহকারী পরিচালকের কার্যালয়ের মুখ্য পরিদর্শক রুহুল আমিন ও ফজলুল হক বাংলাট্রিবিউনকে জানান, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত মালেক জুট মিল, নবারূন জুট মিল, উত্তরা জুট ফাইবার্স, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ও বন্দরের মদনপুরে অবস্থিত সুরুজ জুট স্পিনিং মিলে কাঁচাপাটের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজী জুট মিল, মনোয়ার জুট মিল, তাজ জুট প্যাকিং কোম্পানী, প্রাইম জুটেক্স, কাঁচপুরে এলাইড জুট মিল, বন্দরের সারোয়ার জুট মিল, রূপগঞ্জের গাউছিয়া জুট মিল, মাসরিকী জুট মিলসহ বেশ কিছু জুট মিল দীর্ঘদিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের পাশে ডেমরায় লতিফ বাওয়ানী ও করিম জুট মিল এবং নরসিংদীতে ইউএমসি ও বাংলাদেশ জুট মিল রয়েছে যেগুলো সরকারি জুট মিল। পাটপণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কাঁচাপাটের দামও বেড়েছে। আগে প্রতি মন ১৯০০-২০০০ টাকা দরে বিক্রি হতো বর্তমানে ২১০০-২২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
জনতা জুট মিলের সাবেক সিবিএ সভাপতি ও পাটকল সিবিএ এর ঢাকা বিভাগের সাবেক সমন্বয়কারী বাচ্চু মিয়া জানান, আদমজীর পরেই অনেক মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময়ে শ্রমিকেরা কাজের জন্য অনেক তদবির করতো। এখন আর আগের মতো শ্রমিক নাই। আসছেও না।
এদিকে শুধু পাটকলের জন্যই নয় নারায়ণগঞ্জ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচাপাটও রফতানি করা হয়ে থাকে। যা থেকে আয় হয় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। সারাদেশে অন্তত দেড় শতাধিক রফতানিকারক রয়েছেন যার মধ্যে প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জেই রয়েছেন অন্তত ২৫ জন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায়ী রয়েছেন আরও শতাধিক। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে অন্তত ১০ হাজার শ্রমিক। শহরের নিতাইগঞ্জ, খানপুরের কুমুদিনী, গোদনাইল, বন্দর এলাকায় বেশ কিছু পাটের প্রেস হাউস রয়েছে।
এদিকে, ৫ মাস বন্ধ থাকার পরে দেশের সোনালী আঁশ খ্যাত কাঁচাপাট রফতানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে নারায়ণগঞ্জে রফতানিকারক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে ফিরতে শুরু করেছে কর্মচাঞ্চল্য। ব্যবসায়ীরা নতুন করে কাঁচাপাট সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন। রফতানিকারকরা যোগাযোগ করছেন বায়ারদের সঙ্গে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে কাঁচাপাটের দরও। নারায়ণগঞ্জের পাট প্রেস হাউসগুলোতে নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছে শ্রমিকরা।
/টিএন/







