আশুলিয়ার দুর্ধর্ষ সেই ব্যাংক ডাকাতির এক বছর

নাদিম হোসেন, সাভার
২১ এপ্রিল ২০১৬, ২১:২৪আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৬, ২১:৩১

২০১৫ সালের ২১ এপ্রিল, আজকের এই দিনে আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজার এলাকায় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া বাজার শাখায় দুর্ধর্ষ ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওই দিন ডাকাত সদস্যদের তাণ্ডব ও পরে এলাকাবাসীর গণপিটুনীতে ১ ডাকাত সদস্যসহ মোট আটজন  নিহত হন। সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি ওই বাজারের ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দারা।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের আশুলিয়া কাঠগড়া শাখা

কী হয়েছিল সেদিন

দুপুরের খাবার শেষ করে ব্যাংক কর্মকর্তা ও গ্রাহকরা লেনদেন শুরু করেছেন মাত্র, এমন সময় গ্রাহকের বেশে ব্যাংকের ভেতর ডাকাতদলের তিন সদস্য প্রবেশ করেন। বাইরে মূল ফটকের সামনে আরও তিন ডাকাত পাহারায় নিযুক্ত। ডাকাতরা ভেতরে প্রবেশের পর কিছু বুঝে ওঠার আগেই চাপাতির আঘাতে কুপিয়ে গুরুতর আহত হন ব্যাংকের নিরাপত্তা কর্মী বদরুল ইসলাম।

ডাকাত দলের বাকি সদস্যরা তখন ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ওয়ালিউল্লার কক্ষে প্রবেশ করে টেবিলের ওপর একটি বোমা রেখে ভল্টের চাবি কোথায় জানতে চান। ব্যাংক কর্মকর্তা ওয়ালিউল্লাহ ভল্টের চাবি দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ডাকাত সদস্যরা তাকেও এলোপাথাড়ি কুপিয়ে ও গুলি করে ক্যাশে থাকা নগদ টাকা লুট করে নেন।

এক পর্যায়ে স্থানীয়রা একটি মসজিদে মাইকিং করে ডাকাত প্রতিহত করার ঘোষণা দিলে ডাকাত সদস্যরা জীবন বাঁচাতে ব্যাংকের ভেতর ও বাইরে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যেতে থাকে। ডাকাতদের ছোড়া গুলিতে বিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ওয়ালিউল্লাহ, নিরাপত্তা কর্মী বদরুল ইসলাম, ব্যাংকের গ্রাহক ব্যবসায়ী পলাশ, ব্যংকের নিচে অবস্থিত ওয়ার্কসপ মালিক জিল্লুর রহমান নিহত হন।

পালানোর সময় তিন ডাকাত সদস্যকে আটকে স্থানীয় জনতা গণপিটুনি দিলে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক ডাকাত সদস্য ঘটনাস্থলেই মারা যান। ডাকাত সদস্যদের হামলায় গুরুতর আহত কাঠগড়া বাজারের একটি দর্জি দোকানের কর্মচারী জমির উদ্দিন, স্থানীয় বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ ও আইয়ূব আলী সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

কেমন আছে নিহতদের পরিবার

সেদিন ডাকাতের হামলায় নিহত হন আইয়ূব আলী। তার ছেলে রবিউল ইসলাম সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাংকে যখন ডাকাত হানা দেয় তখন মসজিদ থেকে মাইকিং করে বলা হয় বাজারের মধ্যে ব্যাংকে ডাকাতি হচ্ছে। তখন আমি আর বাবা এক দৌড়ে ব্যাংকের কাছে যাই। তখন কয়েকজন ডাকাত ব্যাংকের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিল। বাবা একটি বাশের মই দিয়ে ডাকাত সদস্যদের গতিরোধ করার চেষ্টা করলে ডাকাত সদস্যরা শটগান দিয়ে বাবাকে গুলি করে।’

সুমন আরও জানান, ‘ডাকাত সদস্যরা যখন বাবাকে গুলি করে তখন আমি তাদের বন্দুক ধরে ফেলে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তারা আমাকে এলোপাথাড়ি আঘাত করে পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় ছুরি দিয়ে বাবার বুকে জখম করে যায়।পরে বাবাকে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন থাকার তিন দিন পর তিনি মারা যান।

আরও পড়ুন:  উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসহ রুয়েটের দুই কৃতি ছাত্র বিদ্যুতের ‘গ্রাহক বান্ধব’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেন রুয়েটের দুই শিক্ষার্থী

আক্ষেপের সুরে সুমন আরও যোগ করেন, ‘বাবা মারা যাওয়া পর আমাদের পরিবারে নেমে আসে আর্থিক অনটন। সেসময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাকে একটা চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিলেও আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে আমাদের পরিবারকে।’

বাজারের অপর এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, ডাকাত প্রতিহত করতে গিয়ে আমি গুলিবিদ্ধ হই। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে এখন কিছুটা সুস্থ হলেও ঠিকমতো বসতে পারি না। জীবনে তিনি এমন ভয়াবহ তাণ্ডব এর আগে কোথাও দেখিনি।  সেদিনের স্মৃতি মনে পড়ে গেলে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠি। বাজারে যখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে থাকি তখন অপরিচিত লোক দেখলেই মনের ভেতরে এক অজানা ভয় কাজ করে।

নিরাপত্তা দানের বর্তমান চিত্র

ব্যাংক ডাকাতির পর কাঠগড়া বাজার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হলেও ইদানিং বাহিনীর সেই নিরাপত্তা বলয় নেই বলে দাবি করেন মার্কেট মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

কাঠগড়া বাজার ব্যবসায়ী উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ বলেন, যখন আমাদের বাজারে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল, তখন পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বাড়তি নজরদারী লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু সেই নজরদারী বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র ২-৩ মাসের মধ্যেই সেই নজরদারী তুলে নেওয়া হয়।

অদূর ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা যে আর ঘটবে না এর নিশ্চয়তা নেই বলে মন্তব্য করে এই ব্যবসায়ী আবারও আগের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারী বৃদ্ধির দাবি জানান। এছাড়া কাঠগড়া বাজারে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়। এখানে পুলিশের একটি স্থায়ী ক্যাম্প বাসানো দাবিও জানান তিনি।

অপরদিকে, শুধু কাঠগড়া নয় পুরো আশুলিয়াই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরে আছে বলে জানান আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসিনুল কাদির। ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দায়েরকৃত মামলার বিষয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, গত বছরের পহেলা ডিসেম্বর আশুলিয়া থানা পুলিশ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পলাশ নামের এক ডাকাত এখনও পলাতক রয়েছে বলে জানান ওসি।

/এইচকে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
শিশুর হাতে স্মার্টফোন: আশীর্বাদ না অভিশাপ? 
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে কিমের বড় ঘোষণা
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান