অবশেষে বগুড়ার নওয়াব প্যালেস রক্ষায় গেজেট

বগুড়া প্রতিনিধি
১৬ মে ২০১৬, ২০:৩৫আপডেট : ১৬ মে ২০১৬, ২০:৩৯

নওয়াব প্যালেস সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বগুড়ার নওয়াব প্যালেসকে ‘সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ’ ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। এর ফলে অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর স্মৃতি বিজড়িত প্রাসাদটি বিক্রির হাত থেকে বেঁচে গেল। বগুড়াবাসীও এতে আনন্দিত।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গত ১৯ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপন মোতাবেক সরকার এ গেজেট প্রকাশ করলো। রাষ্ট্রপতির আদেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ছানিয়া আক্তার স্বাক্ষরিত গেজেট সোমবার দুপুরে বগুড়ায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানার হাতে পৌঁছেছে। পরবর্তী নির্দেশ এলে সংরক্ষণের কাজ শুরু হবে। তিনি বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে জানিয়েছেন। এছাড়া তিন ক্রেতাকেও চিঠি দেওয়া হচ্ছে।
বগুড়া শহরের সুত্রাপুর মৌজার ১৭০৮ নম্বর দাগে তিন একর ৭৫ শতক বা প্রায় ১০ বিঘা জমিতে নওয়াব প্যালেস ও অন্যান্য স্থাপনা ছিল। ১৮৮৪ সালে প্যালেসটি নির্মাণ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার অনেক পরে মোহাম্মদ আলীর স্বজনরা এক একর ৫৮ শতক বাদে অবশিষ্ট বিক্রি করে দেন। সেখানে আল-আমিন কমপ্লেক্স, টিএমএসএস মহিলা মার্কেট, শরিফ উদ্দিন সুপার মার্কেট, র‌্যাংগস গ্রুপ, বহুতল রানা প্লাজা।
মোহাম্মদ আলী ও তার প্রথম স্ত্রী হামিদা বানুর কবর বাদে প্যালেসের ১.৫৫ একর জমির ওপর বগুড়ার কয়েকজন ‘নব্যধনীর’ নজর পড়ে। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে তারা অমূল্য এ সম্পদ গ্রাস করার চেষ্টা করেন। টের পেয়ে সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ আন্দোলন শুরু করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর যখন প্যালেসটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণে চিঠি বিনিময় করছিল ঠিক তখন তিন ব্যবসায়ী গোপনে প্যালেসটি কিনে নেন। মোহাম্মদ আলীর প্রথম স্ত্রীর দুই ছেলে সৈয়দ হামদে আলী চৌধুরী ও সৈয়দ হাম্মাদ আলী চৌধুরী গত ১৫ এপ্রিল ছুটির দিন ঢাকায় বসে কমিশনের মাধ্যমে দলিলে দস্তখত করেন। ১৭ এপ্রিল বগুড়া রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল (নং-৪৩১৮) সম্পাদন হয়। দলিলে অমূল্য এ সম্পদের মূল্য ধরা হয়ে মাত্র ২৭ কোটি ৪৫ লাখ ৭ হাজার টাকা। যৌথভাবে কেনেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব মমতাজ উদ্দিনের বড় ছেলে ও বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাছুদুর রহমান মিলন, চেম্বারের সহ-সভাপতি ও হাসান গ্রুপের স্বত্ত্বাধিকারী এটিএম শফিকুল হাসান জুয়েল এবং চেম্বারের সাবেক সহ-সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল গফুর।

আরও পড়ুন: ‘তোমাদের স্বপ্ন ভেঙে চলে যাচ্ছি, আমার নিজেরই কোনও স্বপ্ন বেঁচে নেই’

এদিকে নওয়াব প্যালেস বিক্রির খবরটি জানাজানি হলে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ মানববন্ধন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান এবং লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। বিক্রির আগে গত ৯ মার্চ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। মন্ত্রণালয় জানার পর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ নওয়াব প্যালেসকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সরকারি মুদ্রণালয়ে যোগাযোগ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং এর গেজেট কপি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। অনুলিপি দেওয়া হয় সংস্কৃতি মন্ত্রীর একান্ত সচিব, বগুড়ার জেলা প্রশাসক ও সচিবের একান্ত সচিবকে।
নওয়াব প্যালেস অন্যদিকে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় ৮ মে রাতে ক্রেতারা নওয়াব প্যালেসের সাইনবোর্ড ঢেকে দিয়ে সেখানে ক্রয় সূত্রে সম্পত্তির তিন মালিকের নাম লেখা হয়েছে। পরদিন সকালে এ দৃশ্য দেখে সচেতন বগুড়াবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়। অবশেষে সোমবার দুপুরে এ সংক্রান্ত গেজেট বগুড়ায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ) নাহিদ সুলতানার হাতে পৌঁছে।
গেজেটে বলা হয়েছে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ১৯ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপন অনুসারে ১৯৬৮ সালের (১৪নং আইন) (১৯৭৬ সালে সংশোধিত) পুরার্কীতি আইনের ১০ ধারার (১) উপ-ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার কর্তৃক নিম্ন তফসিলভুক্ত প্রত্নসম্পদ ‘সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ’ বলে ঘোষণা করা হলো।
আরও পড়ুন: সুপারমার্কেট মালিকদের দাবি বিবেচনা করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
বগুড়ায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, নওয়াববাড়ি এখন সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ। সরকারের অনুমতি ছাড়া এর কোনও পরিবর্তন বা সৌন্দর্যহানী করা যাবে না। তিনি জানান, গেজেটের বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ডিজি অতিরিক্ত সচিব আলতাফ হোসেনের নির্দেশ পেলে নওয়াব প্যালেসে নোটিশ ঝোলানো ও দেখাশোনার জন্য লোক রাখা হবে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বগুড়া সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) আরাফাত রহমান জানান, গেজেট হলে জেলা প্রশাসক অফিসের অধিগ্রহণ শাখা নওয়াব প্যালেসকে অধিগ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে ক্রেতা বা মালিকদের মূল্য পরিশোধ করতে হবে।

ক্রেতা আবদুল গফুর জানান, তারা সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন।

বগুড়ার অন্যতম সংস্কৃতিজন তৌফিক হাসান ময়না জানান, সরকার নওয়াব প্যালেসকে ‘সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ’ ঘোষণা দেওয়ায় ক্রেতারা ছাড়া সবার মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। তিনি শহরের জিলা স্কুলের ঐতিহাসিক থমসন হল ও দখল হয়ে যাওয়া অন্যান্য প্রত্নসম্পদ অধিগ্রহণ করতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

/এজে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম