যমুনার পশ্চিম পাড়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধ ঘোষণার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছে ট্রাক শ্রমিকরা। খবর পেয়ে পুলিশ অবরোধ তুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জ করে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জেলা শহরের গোশালা রেলগেট মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। অবরোধ চলাকালে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত এক সহকর্মীর মুক্তির দাবিতে রবিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ট্রাক ধর্মঘটের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। এ সময় শ্রমিকদের পাশাপাশি জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাব ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মুন্সীসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড় সয়দাবাদ থেকে পাউবোর শহর রক্ষা বাঁধ ‘হার্ড-পয়েন্ট’ র অদূরে যমুনার পশ্চিম তীরে সরকার দলীয় কতিপয় প্রভাবশালী নির্ধারিত ইজারার এলাকার বাইরে দীর্ঘদিন থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করে আসছে। কতিপয় ট্রাক মালিক-চালকের যোগসাজসে অবৈধভাবে উত্তোলনকৃত এসব বালু শহর ও আশেপাশে বিক্রি করে ওই সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের কারণে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ের গাইড বাঁধ থেকে শহর রক্ষা বাঁধ ‘হার্ড-পয়েন্ট’ হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সেতু কর্তৃপক্ষ ও পাউবোর লোকজন বারবার প্রশাসনকে অবগত করে আসছিল। এ বিষয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় একাধিক সচিত্র প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। কিন্তু অবৈধ বালি উত্তোলন কোনোভাবেই বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে সেতু কর্তৃপক্ষ ও পাউবো থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়। পরে মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। মঙ্গলবার (২ আগস্ট) জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রেনজন চাম্বুগং ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যমুনার পশ্চিমপাড়ে পাউবোর বাঁধের পাশে অভিযান চালান। অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১০/১২ জনকে আটক করে জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এর মধ্যে ট্রাক চালক সদর উপজেলার বহুতী গ্রামের রফিকুল ইসলাম (২৫) রয়েছেন। এ ঘটনার পর বুধবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে থেকে ট্রাক মালিক-শ্রমিক নেতাদের ডেকে সতর্কও করা হয়। এরই প্রতিবাদে ও সহকর্মীর মুক্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ ও অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের আল্টিমেটাম দেন।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল ওয়াহাব ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মুন্সী বলেন, জেলা প্রশাসন যমুনায় বালি উত্তোলনের জন্য পত্র-পত্রিকায় টেন্ডার আহ্বানের মাধ্যমে ঘটা করে ইজারা দেন। আমরা ইজারাদারদের উত্তোলন করা বালু দীর্ঘদিন থেকেই পরিবহন করে আসছি। কিন্তু, চালকদের ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা এবং পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক বাসু দেব সিনহা জানান, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা শহরে রাস্তা বন্ধ করে যানবাহন চলাচলে বাধা দিলে পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণ করে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রেনজন চাম্বুগং বলেন, বালু ইজারায় শর্ত রয়েছে শহর রক্ষা বাঁধের পাশ থেকে বালি উত্তোলন করা যাবে। শহর বাঁধ থেকে কমপক্ষে এক কি.মি. পূর্বদিকে যমুনার চরে বালি তোলা যাবে। কিন্তু কতিপয় লোকজন বাংলা ড্রেজার ও ভলগেট দিয়ে পাউবোর বাঁধের পাশে অবৈধভাবে বালি তুলছিল। পাউবোর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার অভিযান চালিয়ে চালক, ভলগেট ও ড্রেজারের লোকজনসহ ১২ জনকে সাজা দেওয়া হয়।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন, আমি নিজেই বিচারক, আমার কোর্টেই শ্রমিকদের মামলাটি রয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই। আপনারা বরং জেলা প্রশাসক মহোদ্বয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, যমুনায় নির্দিষ্ট চরে তিনটি বালু মহাল ইজারা দেওয়া হলেও কতিপয় লোকজন অবৈধভাবে পাউবোর বাঁধের পাশ থেকে বালি উত্তোলন করায় বুধবার অভিযান পরিচালিত হয়। সেতু কর্তৃপক্ষ ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সেনাবাহিনীর লোকজনও এসব বালু মহাল পর্যবেক্ষণ করছেন। পাউবোর বাঁধ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করার বিষয়ে শ্রমিক নেতাদেরকে প্রশাসনের অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে। তাই এসব বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
পাউবোর রক্ষণাবেক্ষণ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম ও বিআরই (বিশেষায়িত) শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী শাহিন রেজা বলেন, যমুনার পশ্চিম পাড়ে পাউবোর বাঁধের অদূরেই দীর্ঘদিন থেকে শুধু ইজারাদার নয়, বরং এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অবৈধভাবে ভলগেট ও বাংলা ড্রেজার দিয়ে বালি তুলে আসছিল। সরকারি রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে জেলা প্রশাসন থেকে বালু মহাল ইজারা দেওয়া হলেও বঙ্গবন্ধু সেতু ও শহর রক্ষা বাঁধের স্বার্থে বিষয়টি বরং আগে দেখা উচিত।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, সেতু থেকে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হয়ে উজানের ১৬ কি.মি. অংশে বালি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরও প্রশাসন কিভাবে ইজারা দেন, বিষয়টি বোধগম্য নয়।
আরও পড়ুন:
মুদি দোকানি থেকে দুর্ধর্ষ জেএমবি সদস্য!
‘চোখের সামনে স্বামীরে চুবাইয়া মারলো, ক্যারে আমি প্রতিবাদ করলাম’
/বিটি/







