গরু আসছে না চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে, কোরবানিতে পশু সংকটের আশঙ্কা

মো. আনোয়ার হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
২৭ জুলাই ২০১৯, ১৫:০৭আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৯, ১৬:১৯





গরুশূন্য খাটাল কোরবানির ঈদ ঘিরে প্রতিবছর যে পরিমাণ ভারতীয় গরু দেশে ঢোকে, এর বেশিরভাগই আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর ও ভোলাহাট সীমান্ত দিয়ে। তবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কড়াকড়িতে এসব সীমান্ত দিয়ে গরু আসা এখন প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে কোনও কোনও খাটাল একবারে গরুশূন্য হয়ে পড়েছে। তাই এবার কোরবানি পশুর সংকট তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা; যদিও জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর বলছে, স্থানীয় পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।
জানা যায়, গত বছরও কোরবানির ঈদের আগে ভারতীয় গরুতে সরগরম ছিল সরকার অনুমোদিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিট ও খাটালগুলো। এবার গরু আসা একেবারেই বন্ধ রয়েছে। অবৈধপথে কিছু পশু আনা হলেও এ পথে রয়েছে ঝুঁকি। চোরাইপথে গরু আনতে গিয়ে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ী ও রাখাল নিহত হচ্ছেন প্রায়ই। সম্প্রতি বিএসএফের গুলিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্তে অনন্ত ১৫ বাংলাদেশি রাখাল নিহত হন।
সরেজমিন জেলার বিভিন্ন সীমান্তের খাটালগুলো ঘুরে দেখা গেছে, বিশাল বিশাল খাটাল খাঁ খাঁ করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসা কমে যাওয়ায়, লাখ লাখ টাকা আটকে গেছে তাদের। জেলার সবচেয়ে বড় পশুর হাট শিবগঞ্জ উপজেলার তর্ত্তিপুরে গিয়ে দেখা গেছে, ভারতীয় গরুর আমদানি না থাকায় দেখা দিয়েছে গরুর স্বল্পতা। বেড়েছে দামও। ফলে বেচা-কেনা কমে গেছে। তর্ত্তিপুরে হাটের দিন যেখানে এক লাখেরও বেশি গরু বেচাকেনার জন্য আমদানি হয়, সেখানে এবার ৩০-৩৫ হাজার গরু আসছে।
কোরবানির গরু কিনতে আসা স্থানীয় ক্রেতা এবং ঢাকা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লার ব্যাপারীরা বলেন, ‘অতিরিক্ত দামের কারণে আমরা গরু কিনতে পারছি না। কোরবানিতে গরুর দাম যেমন বাড়তি থাকে, তার চেয়েও বর্তমানে বেশি দামে গরু কিনতে হচ্ছে। এতে হিমশিম খাচ্ছি আমরা। চাহিদা অনুযায়ী, গরু কিনতে পারছি না। কোরবানির পশু সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছি।’

এদিকে, গরু না আসায় আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় আছেন হাট ইজারাদাররা। তর্ত্তিপুর হাটের ইজারাদার আবদুস সালাম ও মনাকষা পশু হাটের ইজারাদার মোজাম্মেল হক জানান, সরকারকে রাজস্ব দিয়ে আমরা হাট পরিচালনা করি। কিন্তু বর্তমানে হাটের যে অবস্থা তাতে আমাদের টাকা উঠবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি শেষ হওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি পর্যন্ত খাটালে গরু আনা বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। অন্যদিকে, এ বছরের এপ্রিল মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিএসএফ পুরো সীমান্ত সিল করে দেয়। নির্বাচনের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র উত্থানে তাদের নেতাদের সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে কোরবানির আগে ভারতীয় পশু আসা একেবারেই কমে গেছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিভাগীয় কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি শুল্ক করিডোরের অধীন সীমান্ত দিয়ে চার লাখ ৫০ হাজার ৭৯১টি ভারতীয় গরু ও মহিষ দেশে আসে। ওই বছর কোরবানির ঈদের আগের এক মাসে ঢুকেছিল দেড় লাখেরও বেশি গবাদি পশু। অথচ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভারত থেকে দেশে এসেছে মাত্র দুই লাখ ৬২ হাজার ৭৪টি গরু; যা গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। গত ডিসেম্বর থেকে এই জুন পর্যন্ত ভারতীয় গরু-মহিষ এসেছে মাত্র ২৫ হাজার ৫৫০টি। অর্থাৎ গত সাত মাসে তেমন ভারতীয় গরু আসেনি।
তবে ভারতীয় গরু না এলেও কোরবানির পশুর কোনও সংকট দেখা দেবে না বলে মনে করেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় গরু আসুক বা না আসুক, কোরবানির পশুর কোনও সংকট হবে না। কোরবানিকে সামনে রেখে দেশে যে পরিমাণ গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও গাড়ল পালন করা হয়েছে, এতে কোরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব।’
ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী আরও বলেন,‘এ কথা ঠিক যে ভারতীয় গরু না এলে দেশি গরুর দাম নায্যমূল্যের চেয়ে বেড়ে যায় এবং সিন্ডিকেট তৈরি হয়। এটা জটিল একটি বিষয়। এটা মূল্যায়ন করা কঠিন। এজন্য ভারতীয় গরুর সংকটের অজুহাতে কেউ যেন সিন্ডিকেট করে দেশি গরুর দাম বাড়িয়ে না দেয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাজার নজরদারি করা হবে।’
সীমান্ত হত্যা হ্রাস ও অবৈধভাবে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে করিডোরবিহীন গরু পাচার রোধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে জানান চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৩ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহবুবুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘তাদের ব্যাটালিয়নের অধীনে আটটি খাটাল চালু রয়েছে। অবৈধ পথে গরু আনতে গিয়ে হতাহতের সংখ্যা হ্রাস করতে সীমান্ত এলাকায় সচেতনতামূলক সভা অব্যাহত রয়েছে।’
৫৯ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মাহমুদুল হাসান জানান, তাদের ব্যাটালিয়নের অধীনে দুটি খাটাল চালু রয়েছে। চোরাইপথে গরু আনতে গিয়ে হতাহতের সংখ্যা হ্রাস করতে সীমান্ত এলাকায় ইতোমধ্যে ১২০টি ছোট ছোট উদ্বুদ্ধকরণ সভা করা হয়েছে। সভাগুলো আগামীতে আরও জোরদার করা হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাজকির-উজ-জামান জানান, সীমান্তে গরু আনতে গিয়ে সম্প্রতি হতাহতের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এটা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাসিক সভায় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় খামার মালিক কামাল হোসেন বলেন, ‘ভারতীয় গরুর প্রবেশ দেশে কমে গেলে এবং দেশীয় খামারিরা ন্যায্যমূল্য পেলে আগামীতে গরুর উৎপাদন বাড়বে এবং পরনির্ভরশীলতা কমবে।’

/আইএ/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
নতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
শিশু রামিসা হত্যা মামলানতুন নাম জড়ানোর চেষ্টা বিচার বিলম্বের কৌশল: ডিএমপি কমিশনার
মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংকটও রয়ে গেছে: সিপিডি
মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংকটও রয়ে গেছে: সিপিডি
অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি
অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি
পুষ্টিগুণে ভরপুর পাঁচমিশালি সবজি ঘণ্ট
পুষ্টিগুণে ভরপুর পাঁচমিশালি সবজি ঘণ্ট
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী