সিরাজগঞ্জে পাঁচশ’র বেশি হাতুড়ে পশু চিকিৎসক নিয়ে খোদ প্রাণিসম্পদ বিভাগ দুশ্চিন্তায় পড়েছে। এদেরকে কোনোভাবেই অপচিকিৎসা দেওয়া থেকে ঠেকানো যাচ্ছে না। এরা খামারিদের বিভিন্ন অপপরামর্শ দিচ্ছেন। এতে খামারিরা প্রয়োজন ছাড়াই পশুকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছেন। তবে, দেশীয় পদ্ধতিতেও পশু মোটাতাজা ও দুধেল গাভী পালন করছেন অনেক খামারি।
জেলায় পাঁচশ’র বেশি হাতুড়ে পশু ডাক্তার রয়েছে জানিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আকতারুজ্জামান ভুইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালন করে স্বাবলম্বী হতে যুব উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত পশু পালন না করে বরং রাতারাতি হাতুড়ে ডাক্তার হয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। সাধারণ অসুখে তারা পশুকে ঢালাও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন। গবাদি পশুকে মোটাতাজাকরণে খামারিদের ক্ষতিকর স্টেরওয়েড প্রয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন। হাতুড়ে চিকিৎসকদের অ্যান্টিবায়োটিক ও স্টেরওয়েড পরামর্শ নিয়ে আমরাও সংশয়ে আছি। এদের ধরতে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এসেছে। জনবল সংকটের কারণে ঈদের আগে সম্ভব না হলেও ঈদের পরপরই জেলা প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে নিয়মিত অভিযান চলবে। বন্যা পরবর্তী চাহিদার জন্য মাষকলাই বীজ ও ওষুধ চাওয়া হয়েছে। বেসরকারিভাবে ১১ মেট্রিকটন গোখাদ্য সংগ্রহ করে বন্যার্ত অঞ্চলে বিতরণ করা হয়েছে।’
উত্তরাঞ্চলের দুধের বৃহত্তম প্রাপ্তিস্থান বাঘাবাড়িসহ সিরাজগঞ্জের ৯ উপজেলার বিভিন্ন খামারে দেশীয় পদ্ধতিতে গবাদি পশুর মোটাতাজাকরণ চলছে। খামারিরা জানান, গবাদি পশুর চিকিৎসায় নিয়মিত সরকারি দফতরের লোকজনকে হাতের নাগালে না পেয়ে অনেকেই মাঝেমধ্যে হাতুড়ে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। পশুর যেকোনও অসুখে হাতুড়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে ঢালাও অ্যান্টিবায়োটিকও দেওয়া হচ্ছে। হাতুড়ে চিকিৎসকদের খপ্পরে পড়ে খামারিদের কেউ-কেউ মোটাতাজাকরণে গোপনে ক্ষতিকর স্টেরওয়েড প্রয়োগ করছেন বলে খবর মিলছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আকতারুজ্জামান ভুইয়া জানান, ‘বন্যা উপদ্রুত সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালীতে প্রাণিসম্পদ দফতরের ১০টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। গত নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে ৯ লাখ গবাদি পশুকে টিকা প্রদান করায় এবার জেলায় অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগের উপদ্রপ হয়নি। চলমান বন্যায় ১৩৪২ একর গোচারণ মাঠ প্লাবিত হয়েছে। বন্যার আগেই খামারিরা নিজেদের বাড়িতে আপদকালীন খড়সহ অন্যান্য গো-খাদ্যে মজুত রাখায় কোনও গবাদি পশু এবার মারা যায়নি।’
জেলা প্রাণিসম্পদ দফতর সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জে ১২ হাজার ২২৭টি দুধেল গাভির খামার ও ১৬ হাজার গবাদি পশুর খামার রয়েছে। এসব খামারে প্রায় ১০ লাখ ৮ হাজার গরু এবং প্রায় ৬ লাখ ভেড়া ও ছাগল রয়েছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জেলার ৯ উপজেলায় ১৬ হাজার ৫শ ২৬টি খামারের ৮৮ হাজার ৪শ তিনটি গরু এবং ৫৬ হাজার ছাগল ও ভেড়াকে দেশীয় পদ্ধতিতে মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে। গবাদি পশুদের মোটাতাজাকরণে ভুট্টা, মসুর ও গমের ভুসি, নালি, নেপিয়ার ঘাস, খড়, নরম আখের কুটা, ধানের কুড়া, খইল খাওয়াচ্ছেন খামারিরা।
সাবেক জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. রনজিত চক্রবর্তী বলেন, ‘বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনও দেশেই রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মানুষ বা গবাদি পশুকে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করানো হয় না বা প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধও বিক্রি হয় না। দুধ দেওয়া গাভীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার পর ‘উইথড্রল পিরিয়ড’ থাকে। সে সময়ে বাজারে ওই গাভীর দুধ বিক্রিও নিষিদ্ধ। ওই দুধ খেলে মানবদেহে সংক্রমণ ঘটতে পারে। কোরবানির আগে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী পাম্প ট্যাবলেট নামে এসব স্টেরওয়েড বিক্রি করে। না বুঝেই অনেকে এসব স্টেরওয়েড প্রয়োগ করেন। মূলত নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত গবাদি পশুকে শেষমুহুর্তে বাঁচাতে স্টেরওয়েড প্রয়োগ করা হয়। মোটাতাজা করার জন্য নয়। গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা হাতুড়ে চিকিৎসকরা না বুঝেই পশুকে স্টেরওয়েড বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের পরামর্শ দেন। নিজেরাই জানেন না তারা সমাজের কত বড় ক্ষতি করছেন। হাতুড়ে চিকিৎসকদের পাশাপাশি অসাধু ওষুধ বিক্রেতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ। সরকারি পরিপত্র জারি বা সামাজিকভাবে খামারিদের সচেতন করা দরকার।’
বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা সোসাইটির ব্যবস্থাপক অমিও কুমার মন্ডল বলেন, ‘হাতুড়ে চিকিৎসকদের পাশাপাশি গবাদি পশুর খাদ্য ও ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি।’








