রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি শহরের ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো ও জুয়াবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই সতর্ক হয়েছে রাজশাহীর ক্লাবগুলো। এসব ক্লাবে জুয়ার পাশাপাশি হাউজিও বন্ধ রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিভিন্ন ক্লাবের কর্মকর্তারা। আর
জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি নিয়ে রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার ব্যবস্থাপনায় জিমনেশিয়ামে সন্ধ্যার পর যে হাউজির আয়োজন চলতো সময় খারাপ হওয়ায় সেটাও বন্ধ রাখা হয়েছে। অপরদিকে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চলমান শুদ্ধি অভিযানকে ইতিবাচক মনে করছেন রাজশাহীর শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও ছাত্রসহ সাধারণ মানুষ।
রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার ব্যবস্থাপনায় জেলা জিমনেশিয়ামে সন্ধ্যার পর হাউজি খেলা হয়। এখানে রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ হাউজি খেলেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার থেকে এখানে হাউজি খেলা বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রফিউস সামস প্যাডি বলেন, পদাধিকার বলে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি জেলা প্রশাসকের নির্দেশে এই হাউজি খেলা বন্ধ করা হয়েছে। দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী আবার নির্দেশ পেলে খেলা হবে। তবে হাউজি খেলার জন্য অনুমতি রয়েছে। কিন্তু দেশের শুদ্ধি অভিযানের কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে।
এদিকে নগরীর বিভিন্ন ক্লাব ও আওয়ামী লীগের ভুঁইফোড় সংগঠনগুলোর ব্যানারে অনেক দলীয় কার্যালয়ে সন্ধ্যার পর মদের আড্ডা ও জুয়ার আসর বসতো। শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ায় দ্রুত ভোল পাল্টেছেন এসব ক্লাব ও সংগঠনের কর্মকর্তা বা নেতারা। তারা উল্টো দাবি করছেন, কখনোই তাদের ক্লাব বা সংগঠনের কার্যালয়ে জুয়ার আসর বসতো না।
নগরীর লক্ষ্মীপুর কাঁচাবাজারে অবস্থিত প্রভাতী সংঘের যুগ্ম সম্পাদক জাভেদ আক্তার বেবী বলেন, আমাদের ক্লাবে কোনও জুয়া খেলা হয় না। এখানে তাস খেলা হয়। আবার অনেকে পেপার ও টেলিভিশন দেখে সময় কাটায়।
খেলাধুলা পরিচালনার জন্য ক্লাবের আর্থিক ফান্ড কোথা থেকে আসে—এমন প্রশ্নে এই ক্রীড়া সংগঠক বলেন, এই ক্লাবের অনেক সদস্য বিত্তশীল। তারা ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেন। আর এলাকায় অনেক ক্লিনিক ও ওষুধের দোকান রয়েছে। তারা খেলার সময় অর্থ দিয়ে থাকেন। তাই ক্লাবে জুয়া খেলার প্রশ্নই আসে না।
নগরীর শিরোইল ক্লাবে জুয়া খেলার অভিযোগ থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অভিযান চালানো হয়েছিল। সরকার বদলের পর সব আবার ধীরে ধীরে শুরু হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও বন্ধ রয়েছে সব। এই ক্লাবে এখন তাস খেলাও হয় না।
এ ব্যাপারে শিরোইল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোসাদ্দেকুল কুদ্দুস সিদ্দিকী সেলিম বলেন, দেশের এ অবস্থায় ক্লাবে এখন সবাই পেপার পড়তে ও টেলিভিশন দেখতে আসে। কেউ তাস খেলতেও চায় না। আর এর আগে বউদের অভিযোগে ওয়ান ইলেভেনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করেছিল। তবে জুয়া খেলার জন্য নয়, তারা রাত জেগে ক্লাবে তাস খেলতো। শুধু আমাদের ক্লাবই নয়, নগরীর সব ক্লাবই তাস খেলা বন্ধ করে দিয়েছে।
ভুঁইফোড় সংগঠনের ব্যানারে অস্থায়ী অনেক কার্যালয়ে জুয়া খেলার অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল ইসলাম বাবুল কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
এদিকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল খালেক বলেন, দুর্ভাগ্যজনক যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে সব বিষয় দেখতে হয়। যদিও এসব আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর আগে থেকেই দেখা উচিত ছিল। তারপরও বিলম্বে হলেও এই শুদ্ধি অভিযান ভালো পদক্ষেপ বলেই বিবেচিত হবে। এটা দেশের ও দলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ থেকে শুরু করে দলের অভ্যন্তরে এই ধরনের শুদ্ধি অভিযান চললে দলের বিকাশের জন্য যেমন সহায়ক হবে তেমনি দেশের জন্যও মঙ্গল বয়ে আনবে। সাধারণ মানুষ বুঝতে শিখবে এই সরকার দুর্নীতিবাজদের কোনও ছাড় দেয় না, তা যে দলেরই হোক না।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সাইদুর রহমান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে চলমান শুদ্ধি অভিযান সময়োপযোগী ও সাহসী এক পদক্ষেপ। দলের ভেতরেই যদি আগাছা থাকে তাহলে সেসব আগাছা আগে পরিষ্কার করা উচিত। তাতে দলেরই ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। কারণ, শাস্তি না পাওয়ার জন্যই সব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। শাস্তি পাওয়ার ভয় থাকলে দলের অভ্যন্তরে অন্য যারা দুর্নীতিবাজ আছে তারাও শোধরানোর সুযোগ পাবে। এই শুদ্ধি অভিযান দলের ভেতর ও দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।
রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, এই শুদ্ধি অভিযান শুধু ছাত্রলীগ বা যুবলীগের বিরুদ্ধে না, সব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেই। এই অভিযানকে আমরা স্বাগত জানাই। আমি মনে করি এই অভিযান আওয়ামী লীগের মধ্যেও হওয়া উচিত। তাহলে আমাদের মূল সংগঠন আওয়ামী লীগও পরিশুদ্ধ হবে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনি বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপে দেশের সুশাসন নিশ্চিত হয়। ব্যবসায়ীরা নিরাপদ ও নিশ্চিন্তমনে ব্যবসা করতে পারেন। কারণ, তখন কোনও পেশিশক্তির ব্যবহার থাকে না। আমরা ব্যবসায়ীরা চাই, লিগ্যাল ওয়েতে ব্যবসা করতে। যাতে সেখানে কোনও অনিয়ম বা দুর্নীতি না থাকে। এই দুর্নীতিবাজদের ধরার ফলে ব্যবসায়িক কোনও মন্দা দেখা তো দেবেই না, উপরোন্তু, ব্যবসায়ে গতি সঞ্চার হবে। এই ধরনের শুদ্ধি অভিযান রাজশাহীসহ সারাদেশে শুরু হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
রাজশাহী কলেজের শিক্ষক তোফায়েল আহমেদ বলেন, দুর্নীতি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। আর সেখানে পেশিশক্তির ব্যবহার তো কমন একটা বিষয়। এরকম রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে কখনও যে অভিযান হবে তা কেউ কোনোদিন কল্পনাতেও নেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটা করে দেখালেন যে তিনি সব পারেন। দুর্নীতিবাজ যত বড়ই হোক তার কোনও ছাড় নেই। এই শুদ্ধি অভিযান চলমান রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের ছাত্র আতিকুর রহমান বলেন, এই শুদ্ধি অভিযানের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। সরকারের যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে এই অভিযানের মাধ্যমে তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আবার সত্যি সত্যিই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সরকারের শুদ্ধি অভিযান হতে পারে। তবে লোক দেখানো না সত্যি সত্যি তা নির্ভর করবে এর ধারাবাহিকতা কতদূর গড়ায় তার ওপর।
সংস্কৃতি-কর্মী রুকাইয়া ইবনে তাহুরা বলেন, ‘দুর্নীতির সঙ্গে আমাদের সোসাইটির একটি ইনভল্বমেন্ট আছে। এটা দীর্ঘদিনের ইতিহাস। এই আগাছা সরাতে সময় লাগবে। তবে শুরুটা তো হতে হবে। সেই শুরুটাই হয়েছে। দেখা যাক, কতদূর পর্যন্ত বজায় থাকে।’
রাজশাহী নগরীর দড়িখরবোনা এলাকার চা বিক্রেতা মতিউর রহমান বলেন, এধরনের অভিযান সবসময় থাকলে ভালো হয়। কারণ, অবৈধভাবে অর্থ আয় করে বিভিন্ন অপকর্মের আশ্রয় নিয়ে থাকে তারা।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপ কমিশনার গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, নগরীতে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনও নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে শোনা যাচ্ছে ক্লাব বা সংগঠনগুলো জুয়া খেলা বন্ধ রেখেছে। তারা আগাম সর্তকতা হিসেবে এসব বন্ধ করে থাকতে পারে। তবে মাদক, জুয়া খেলার বিরুদ্ধে আগে থেকেই আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা হয়ে আসছে।







