নাটোরের লালপুরে সড়কে প্রাইভেটকারের পাশ থেকে চালকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাইভেটকারটিতেও রক্ত ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা চালককে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতারও করেছে।
বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাত ১০টায় উপজেলার গোপালপুর-লালপুর সড়কের গোপালপুর মিলস্ হাইস্কুলের পাশের রাস্তা থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। নিহত ব্যক্তির নাম সাইদুর রহমান (৩৫)। তিনি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা রেলগেট এলাকার বামনগ্রামের বাসিন্দা।
বৃহস্পতিবার রাতেই নিহতের ছোট ভাই আলমগীর হোসেন (৩৩) লালপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে তাওহীদুল ইসলাম নামের একজনকে গ্রেফতার করে শুক্রবার (৮ আগস্ট) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে নাটোর জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেফতার তাওহীদুল ইসলাম কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাহেরমালি এলাকার মহিদুল ইসলামের ছেলে।
এ বিষয়ে লালপুর থানার ওসি মমিনুজ্জামান বলেন, প্রাইভেটকারের ভেতর থেকে একটি রক্তমাখা ছুরিও জব্দ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একজনকে গত রাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে আরও যারা জড়িত, তাদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলের সড়কে একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকারের দরজায় রক্ত দেখতে পান কয়েকজন। পরে তারা সেখানে গিয়ে গাড়ির পাশে সড়কের ওপর এক ব্যক্তির গলাকাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।
তাৎক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাগজপত্র দেখে জানতে পারে, ওই ব্যক্তি গাড়িটির চালক। এ সময় ওই গাড়িতে থাকা এক ব্যক্তিকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। রক্তমাখা গাড়িটির পাশাপাশি ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা একটি ধারালো ছুরি ও কাগজপত্র জব্দ করেছে পুলিশ।
স্থানীয়রা জানান, রাত ১০টায় নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস হাইস্কুল সংলগ্ন রাস্তার পাশে এক যুবকের সঙ্গে কয়েকজনের ধ্বস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে থেকে চিৎকার শোনা যায়। স্থানীয়রা এগিয়ে গেলে অজ্ঞাত এক যুবককে গলা কাটা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে।
এ বিষয়ে নিহত সাইদুর রহমানের স্ত্রী তানিয়া খাতুন (৩৬) বলেন, সাইদুর রহমান খুব ছোট থেকে প্রাইভেটকার চালাতেন। তিনি ২০ বছর ধরে প্রাইভেটকার চালানো ও প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। শুরুর দিকে তিনি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক তহিদুল ইসলামের গাড়ি চালাতেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে সে পেশা বাদ দিয়ে তিনি প্রাইভেটকার ড্রাইভিংয়ের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। এ জন্য তিনি এলাকায় ড্রাইভার ওস্তাদ নামে পরিচিত ছিলেন। তবে মাঝে মাঝে তিনি ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করতেন।
তার স্ত্রী বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে তিনি মোবাইল ফোনে তাকে জানান, কুষ্টিয়া থেকে বনপাড়ায় এক যাত্রীকে ভাড়ায় নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পথিমধ্যে ফোনে একবার স্ত্রীকে জানান, রাস্তা ভাঙা থাকায় তিনি লালপুর-গোপালপুর হয়ে যাত্রীকে বনপাড়া নিয়ে যাবেন। পরে জানতে পারেন তাকে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি আহাজারি করে বলেন, আমার তিন ছেলে মেয়েকে নিয়ে কীভাবে চলবো? কী করব? কিছুই বুঝতে পারছি না। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
এ বিষয়ে নাটোর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, নিহতের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত তাওহীদুল ইসলাম সাইদুর রহমানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, সাইদুর রহমান অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন। তাই সে-ই রাগ ও ক্ষোভে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে তাকে হত্যা করেছেন তিনি। তবে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে পুলিশ অধিকতর তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নিশ্চিত করে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ইফতে খায়ের আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি গাড়ি থেকে নেমে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। প্রাইভেটকারটি কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে এসেছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ করে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।









