উদ্বোধনের আগেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নবনির্মিত ১০তলা বিশিষ্ট ‘বিজয় ৭১’ হলের ভবনের বেশ কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফাটল মেরামতের পরও ভবনের বিভিন্ন অংশের পলেস্তারা খসে পড়ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় ভবনটির নির্মাণকাজের মান ও নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ভবনটির নির্মাণকাজ করছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোচিত ‘বালিশকাণ্ডের’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স অ্যান্ড কোম্পানি। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভবনে ফাটল বিষয়ে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই হলেরই মিলনায়তনের ছাদ ঢালাই শেষে ধসে পড়েছিল। এতে ১২ শ্রমিক আহত হয়েছিলেন। তখন উঠে আসে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও নির্মাণকাজের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হল ও মন্নুজান হল ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে শের-ই-বাংলা হলের কিছু শিক্ষার্থীকে অস্থায়ীভাবে এই ভবনে স্থানান্তর করে প্রায় তিন মাস আগে। তবে নতুন ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতর সূত্রে জানা গেছে, ১০তলা আবাসিক হল এবং ২০ তলাবিশিষ্ট বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করছে রূপপুরের ‘বালিশকাণ্ডে’ আলোচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে আবাসিক হলটি এবং ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে বিজ্ঞান ভবন।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন দুটির কাজ শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। নির্মাণ চলাকালে বিদ্যুতায়িত হয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ট্রাকের চাপায় হিমেল নামে এক শিক্ষার্থীও নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি হলটির মিলনায়তনের ছাদ ঢালাইয়ের সময় ধসে অন্তত নয় শ্রমিক আহত হন। প্রায় ২৪ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই আবাসিক হলে এক হাজার ১০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হলটিতে চারটি আধুনিক লিফট, একটি বড় মসজিদ ও ৩০০ আসনবিশিষ্ট অডিটরিয়াম রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের বহুতল চারটি ভবনের নির্মাণকাজ তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর শেষ হওয়ার কথা চলতি মাসে। অথচ কাজ শেষ হয়েছে ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশ। বর্তমানে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ আরও এক দফা বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। প্রকল্পগুলোর নির্মাণ শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ না হলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে অসম্পাদিত কাজের মূল্যমানের ওপর দশমিক শূন্য ৫ থেকে দশমিক ১০ শতাংশ জরিমানা গুনতে হবে। এই হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৩ কোটি টাকার জরিমানা আদায় না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদফতরের প্রতিবেদনেও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রথমে ৩৬৩ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় অপরাজিতা (সাবেক প্রস্তাবিত শেখ হাসিনা) হল, বিজয় ৭১ (সাবেক প্রস্তাবিত এ এইচ এম কামারুজ্জামান) হল, ১০তলা শিক্ষক কোয়ার্টার, ২০তলা একাডেমিক ভবন, ড্রেন নির্মাণ, শেখ রাসেল মডেল স্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। পরে একনেক ২০১৯ সালে সংশোধিত আকারে ৫১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। নির্মাণাধীন এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তিন দফায় সময় বাড়িয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলা বিজয় ৭১ হলের নির্মাণকাজ পায় রূপপুরে ‘বালিশকাণ্ডে’ তুমুল আলোচিত মজিদ সন্স অ্যান্ড কোম্পানি। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর হলটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাজটি সম্পন্ন করে হস্তান্তর করার কথা ছিল।
এখনও ভবনটির পুরো কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। হলটির অফিসকক্ষের কাজ এখনও চলছে। এর মধ্যেই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় নতুন করে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও হল সংসদের সহ-বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক শাহরিয়ার হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শের-ই-বাংলা হলে ফাটল দেখা দেওয়ায় আমাদের অস্থায়ীভাবে এখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু নতুন হলেও বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা যাচ্ছে। এটি নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
শের-ই-বাংলা হল সংসদের নির্বাহী সম্পাদক শাহিব বিল্লাহ বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য আমাদের নতুন হলে আনা হয়েছে। অথচ উদ্বোধনের আগেই এ ভবনেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ রাবি শাখার সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নতুন হলে আসার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পাচ্ছি। এমনকি মেরামতের পরও পলেস্তারা খসে পড়ছে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মিনহাজুল আলম বলেন, ‘ফাটলগুলো তাপমাত্রাজনিত কারণেও হতে পারে। আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানগুলো পরীক্ষা করে দেখব। এগুলো মেরামতযোগ্য এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’
পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতরের পরিচালক এসএম ওবায়দুল ইসলাম জানান, ‘ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক কোনও ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বিম ও দেয়ালের সংযোগস্থল কিংবা প্লাস্টারের ভিন্ন অংশে এ ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে প্রকৌশলীদের একটি দল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। কোনও সমস্যা থাকলে তারা মেরামত করে দেবে।’









