রাজশাহী নগর ও গ্রামাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ আসছে, আবার কিছুক্ষণ পরই চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি শহর থেকে গ্রাম সব খানে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শহর ও গ্রামের চায়ের দোকানে এখন চলছে বিদ্যুতের বেহাল দশার আলোচনা।
গোদাগাড়ী উপজেলার লালবাগ এলাকার বাসিন্দা মশিউর রহমান (৪৫) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার জীবনে বিদ্যুতের এত খারাপ অবস্থা দেখিনি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আট ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না।’
নগরীর অলোকার মোড় এলাকার বাসিন্দা মো. খোকন বলেন, ‘বুধবার বিকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চার বার বিদ্যুৎ ছিল না। এর মধ্যে একবার এলাকার ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ হয়েছে। বাকি সময়ে লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ ছিল না। এভাবে চললে আমরা কীভাবে কাজকর্ম করবো। গরমে আমাদের অবস্থা কাহিল।’
নগরীর বাটার মোড় এলাকার সেলুনে কাজ করেন রাজিব হোসেন। তিনি বলেন, ‘চুল কাটতে অনেকে আসছেন। বিদ্যুতের যাওয়া-আসার কারণে আমরা ঠিকভাবে চুল কাটতে পারি না। কারণ বিদ্যুৎ না থাকায় চুল কাটার মেশিন ব্যবহার করতে পারছি না। আবার বদ্ধ ঘরে দীর্ঘ সময়ে কেউ বসেও থাকতে চায় না।’
একই ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন নগরীর রানীবাজার এলাকার গৃহিণী শেফালি বেগম বলেন, ‘গ্যাসের দামের কারণে ইলেক্টিক চুলা ব্যবহার করতে পারছি না। এতে করে সময়মতো রান্নাবান্নাও করতে সমস্যা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছয়-সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। বাকি সময় লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। ফলে গরমে অবস্থা কাহিল আমাদের। এর থেকে কবে পরিত্রাণ পাবো? কারও কোনও কথায় সুখবর পাচ্ছি না।’
লোডশেডিংয়ের এমন পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। তারা রাজশাহী জেলার ১৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা চেয়ে প্রশাসনে চিঠি দিয়েছে।
বুধবার বিকালে পুঠিয়া উপজেলার ভড়ুয়ারপড়ার মোড়ে একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সবাই লোডশেডিং নিয়ে কথা বলছেন। বিদ্যুৎ নিয়ে মন্ত্রীদের কথা শুনে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে একজন সাইদুর রহমান বলেন, ‘দিনে বিদ্যুৎ না থাকলে মানা যায়। কিন্তু রাতে ঘুমানোর সময় বিদ্যুৎ না থাকলে মানা যায় না। সারাদিন কাজ কর্ম করে বাসায় এসে শন্তিতে ঘুমাতে পারি না। এমন কষ্ট সবার। দিনে নগরজুড়ে দুই থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করে। একবার গেলে কমপক্ষে এক ঘণ্টা পরে আসে। আর গ্রামাঞ্চলে ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে না। সমস্যা সমাধানে সরকারের দায়িত্বশীলদের কোনও উদ্যোগ দেখছি না।’
দুর্গাপুর উপজেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ছয়-সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে। এতে উপজেলার শিল্প-কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিসের কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় দেখা মিলছে না পানির। ফলে গভীর নলকূপ থেকে সেচের মাধ্যমে আমন ধান রোপণের কাজে নামেন চাষিরা।
দুর্গাপুর বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রতিদিন গড়ে ১৮ থেকে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। অথচ বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেক কম থাকায় তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।
দুর্গাপুর বাজার এলাকায় তুলনামূলকভাবে কিছুটা বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
দুর্গাপুর পৌর এলাকার দেবীপুর গ্রামের কৃষক গোপীনাথ সরকার বলেন, ‘বিদ্যুতের এত বেশি লোডশেডিং যে ধানক্ষেতে ঠিকমতো পানি দিতে পারছি না। পানির অভাবে ধানের গাছগুলোও মরার উপক্রম হতে বসেছে। আমাদের গ্রামের একটি গভীর নলকূপের আওতায় শত শত বিঘা জমির একই অবস্থা।’
দুর্গাপুর উপজেলার হোজা গ্রামের রুবেল হক বলেন, ‘এখন বিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মধ্যে আসে। যার ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে লোডশেডিং। বাচ্চারা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। আমার দুটি পানবরজ রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সেখানেও ঠিকমতো সেচ দিতে পারছি না।’
দুর্গাপুর উপজেলার কয়েকজন ফটোকপি দোকানি জানান, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দোকানের কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ফটোকপি, ছবি তোলা ও অনলাইনের বিভিন্ন কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে দোকান খুলেও বসে থাকতে হয়।
দুর্গাপুর উপজেলার বহরমপুর গ্রামের গভীর নলকূপ অপারেটর তোজু বলেন, ‘আমার ডিপের আওতায় অন্তত শতাধিক বিঘা ফসলি জমি রয়েছে। বর্তমানে কৃষকরা আমন ধান রোপনে ব্যস্ত। এ সময়ে ২৪ ঘণ্টাই জমিতে পানি সরবরাহের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকমতো ডিপ চালাতে পারছি না। ফলে কৃষকরা সময়মতো ধান রোপণ করতে পারছেন না। এতে আমন ধান চাষ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’
দুর্গাপুর উপজেলার হোজা গ্রামের অটোরিকশাচালক আহাদ আলী বলেন, ‘দিন-রাতে মিলিয়ে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। একটি অটো পুরোপুরি চার্জ দিতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকায় অটোতে পর্যাপ্ত চার্জ দিতে পারছি না। ফলে নিয়মিত গাড়ি নিয়ে বের হতে পারছি না, ভাড়াও মারতে পারছি না। এতে পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
দুর্গাপুর পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের (ডিজিএম) মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। এ কারণেই লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ সংকট নিরশনে কাজ করছে। আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ হবে।’
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতায় বাগমারা জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, দিন ও রাতের অধিকাংশ সময়ে বাগমারা উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ৩২/৩৩ মেগাওয়াট হলেও বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৪/১৫ মেগাওয়াট। ফলে দিন-রাত অধিকাংশ সময়ে ৫০ ভাগের বেশি লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে।
এ ব্যাপারে বাগমারা জোনাল অফিসের ডিজিএম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বাগমারার বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি করার জন্য অফিস কতৃক বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করা হলেও দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে কোনও কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। যা বিদ্যুৎ বিভাগসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সুধীজনকে সময়ে সময়ে অবহিত করা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।’
বাঘা উপজেলায় বিদ্যুতের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার সাত ইউনিয়নেই কমবেশি একই চিত্র। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না।
বাঘা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বাঘা ও আড়ানী পৌরসভাসহ সাত ইউনিয়নে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ২০ মেগাওয়াট। কিন্তু রাতে ১০ মেগাওয়াট এবং দিনে মাত্র ৭ দশমিক ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে পর্যায়ক্রমে এক লাইন চালু রেখে অন্য লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় এ অঞ্চলের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’
তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, একদিকে ঠিকমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে না, অন্যদিকে আগের তুলনায় বিদ্যুতের বিল প্রায় দ্বিগুণ আসছে। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামকেন্দ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সুষম বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় লোকজন।
এ ব্যাপারে নেসকোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘বুধবার রাত সাড়ে ৮টায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু আমরা সরবরাহ পাচ্ছি ১১০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কখনও চাহিদার সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, কখনও লোডশেডিং হচ্ছে। এটা প্রতি ঘণ্টায় পরিবর্তন হচ্ছে। তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় গড়ে ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।’
এর আগে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩৯ মেগাওয়াট। তার বিপরীতে সরবরাহ এসেছে ১১৩ মেগাওয়াট। নগরীতে দিনে-রাতে গড় চাহিদা ১৩৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ হচ্ছে ১১১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ গড় ঘাটতি ২৪ মেগাওয়াট।
রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, জেলার পাঁচ উপজেলায় দিনে-রাতে চাহিদা ১১০ থেকে ১১৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। এ অবস্থায় তাদের কেন্দ্রগুলোতে যাতে কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে সে কারণে প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র ব্যবস্থাপক রবেন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও ঘটনা যেন না ঘটে, তাই জেলার ১৪টি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা চেয়ে প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাড়তি নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কোনও উপায় দেখছি না।’









