নাটোরের গুরুদাসপুরে নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জানাজার সময় সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার পর এবার ২০ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২৭০ জন অজ্ঞাতনামা গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ।
বুধবার মধ্যরাতে গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল হক বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় সরকারি কাজে বাধা ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে থানার এসআই মো. রাকিবুল ইসলামকে।
মামলার পর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের ওয়াপদা বাজার, শ্যামপুর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আতঙ্কে অনেক পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন।
পুলিশের ভাষ্য
মামলার এজাহারে পুলিশ জানায়, গত ২৫ আগস্ট নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে চন্দ্রপুর গ্রামের দুই শিশু ফারহান ইসলাম (৮) ও লাম ইসলাম মারা যায়। সন্ধ্যায় তাদের মরদেহ চন্দ্রপুর ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজার আগে দুই শিশুর সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন গুরুদাসপুর থানার এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল আবু রাকিব।
পুলিশের দাবি, আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতের পর জানাজা শেষে লিখিতভাবে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং বিষয়টি থানায় অবহিত করার কথা বলা হয়। এতে উপস্থিত কয়েকজন আপত্তি জানালে একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এজাহারে আরও বলা হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দুই পুলিশ সদস্য স্থানীয় একটি দোকানে আশ্রয় নেন। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত ৮টার দিকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে এক ব্যক্তি বাঁশের লাঠি দিয়ে এসআই আবুল বাশারের মাথায় আঘাত করেন। পরে কয়েকজন বাঁশের লাঠি, কাঠের বাটাম ও লোহার রড নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালান। এতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে তারা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নিলে সেখানেও হামলার চেষ্টা করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে আহত দুই সদস্যকে উদ্ধার করে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
কী ঘটেছিল সেদিন
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৫ আগস্ট দুপুরে ফারহান ও লাম নন্দকুঁজা নদীর তীরে আমবাগানে খেলছিল। পরে তারা নদীতে গোসল করতে নামে। দুজনের কেউই সাঁতার জানতো না। একপর্যায়ে নদীর পানিতে তলিয়ে যায় তারা। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নাটোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। সন্ধ্যায় তাদের মরদেহ ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজার প্রস্তুতি চলছিল। জানাজায় স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী সামসুল হকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের বক্তব্য
স্থানীয় বিএনপি নেতা সামসুল হকের দাবি, জানাজার প্রস্তুতির সময় দুই পুলিশ সদস্য সেখানে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য মরদেহ থানায় নিতে চান। একপর্যায়ে মৃতদেহের কাফনের কাপড় সরিয়ে অ/নাবৃত করা হয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠে। এতে উপস্থিত লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দুই শিশুর অকালমৃত্যুতে এমনিতেই পরিবার ও এলাকাজুড়ে শোকের পরিবেশ ছিল। এর মধ্যে মরদেহ নিয়ে পুলিশের তৎপরতায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশের ওপর চড়াও হয়ে কিল-ঘুষি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
তবে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাটিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করে স্থানীয়রা একই সঙ্গে অভিযোগ করেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত না করে বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা গ্রামবাসীকে মামলায় আসামি করায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন।
তাদের ভাষ্য, জানাজায় প্রায় দেড় হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সঠিক তদন্ত ছাড়া গণহারে গ্রামবাসীকে আসামি করা হলে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন।
জনপ্রতিনিধির আহ্বান
নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আয়ুব আলী বলেন, “পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। তবে বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি রেখে মামলা হওয়ায় গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসুক। কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন—এটাই আমাদের দাবি।”
তদন্তে নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হবে না: পুলিশ
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তদন্ত শুরু করেছেন। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে। কোনও নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হবে না বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নান বলেন, “পুলিশের পক্ষ থেকে যে মামলা করা হয়েছে, তাতে অন্যায়ভাবে কাউকে গ্রেফতার বা হয়রানি করা হবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মামলার বাদী এসআই এমদাদুল হক বলেন, ‘দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। এটি পুলিশের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে হুমকি। প্রকৃত অপরাধীরা যাতে পার না পায়, সে জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে।’









