শীতের সবজি বাজারে আসতে ঢের দেরি। কিন্তু রাজশাহীর পবা উপজেলার আশগ্রামের কৃষক মোশাররফ হোসেনের জমিতে শীতের আগাম সবজি ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রির উপযোগী হয়ে গেছে। মৌসুম শুরুর আগেই বাজারে সবজি তুলে বেশি দাম পাওয়ার লক্ষ্য তার। গত মৌসুমে আগাম সবজি চাষ করে ভালো লাভ পাওয়ায় এবার ৩২ বিঘা জমিতে কপি চাষ করেছেন তিনি। এরই মধ্যে সাড়ে ৭ বিঘা জমির কপি বিক্রি করে বিঘাপ্রতি প্রায় দেড় লাখ টাকা লাভ করেছেন।
সরেজমিনে শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে পবার দামকুড়া ইউনিয়নের আশগ্রাম এলাকায় মোশাররফ হোসেনের জমিতে গিয়ে দেখা যায়, ফুলকপি ও বাঁধাকপির পরিচর্যা করছেন তিনি। কখনো গাছের গোড়ায় মাটি দিচ্ছেন, আবার কখনো সার প্রয়োগ ও আগাছা পরিষ্কার করছেন। তার চোখেমুখে পরিশ্রমের ক্লান্তির চেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে ভালো ফলন ও লাভের প্রত্যাশা।
কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহযোগিতায় ৩২ বিঘা জমিতে আগাম জাতের কপি চাষ করেছেন তিনি। প্রতি বিঘায় প্রায় ৬ হাজার পিস কপি চাষ করেছেন। তার বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা।
আগাম জাতের সবজি চাষের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মোশাররফ বলেন, ‘আগাম সবজি চাষে ঝুঁকি আছে, বিঘা প্রতি প্রায় ২ হাজার কপি নষ্ট হয়। তবে সময়মতো বাজারে তুলতে পারলে দাম ভালো পাওয়া যায়। গতবার ভালো লাভ হয়েছে। তাই এবার আরও বড় পরিসরে চাষ করেছি।’
লাভের হিসাব কষে তিনি জানান, চলতি মৌসুমে ইতোমধ্যে তিন বিঘা জমির ফুলকপি ও সাড়ে চার বিঘা জমির বাঁধাকপি বিক্রি করেছেন। বাজারে প্রতি পিস কপি ৫০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হলেও কোনও কোনও সময় সর্বোচ্চ ৯০ টাকা পর্যন্ত দাম পেয়েছেন। উৎপাদন, পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণসহ সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘা জমি থেকে তার লাভ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সাড়ে ৭ বিঘা জমির কপি বিক্রি করলেও তার চাষ থেমে নেই। আরও ২৫ বিঘা জমিতে কপি চাষ করেছেন। কিছুদিনের মধ্যে এসব সবজি বাজারে তোলার উপযোগী হবে। বাজারদর ভালো থাকলে এবারও ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।
কৃষকেরা বলছেন, শীতকালীন সবজির স্বাভাবিক মৌসুম শুরু হলে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায়। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, গাজরসহ বিভিন্ন সবজির আমদানি বাড়ে। তখন দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু বর্ষা শেষে শীতের সবজি বাজারে ব্যাপকভাবে ওঠার আগের সময়ে সরবরাহ কম থাকায় আগাম সবজির দাম তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই আলিমগঞ্জ এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম এবার ১২ কাঠা জমিতে ৪ হাজার পিস আগাম বাঁধাকপি চাষ করেছেন। তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে ২০০ পিস বাঁধাকপি ৩০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। বাজার ভালো থাকলে বাকি কপি বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি। এতে খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ হতে পারে বলে জানান তিনি।
নজরুল ইসলাম গত বছর ৫ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করে প্রায় ৫ লাখ টাকা লাভ করেছিলেন। এবার কৃষি বিভাগের পরামর্শে ১০ কাঠা জমিতে আগাম জাতের টমেটো চাষ করেছেন। গাছে ফুল এসেছে। আশ্বিনের মাঝামাঝি সময়ে টমেটো বাজারজাত করার আশা করছেন তিনি।
এদিকে পবা উপজেলার হরিপুর, হরিয়ান, দামকুড়া, পারিলা, বড়গাছী, নওহাটা ও পাইকপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আগাম সবজির আবাদ হচ্ছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, মুলা, গাজর, বেগুন, করলা, কাকরোল, লাউ, লালশাক ও ধনিয়াপাতাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন কৃষকেরা। নওহাটা পৌরসভার পাইকপাড়া গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমানও ব্যস্ত আগাম সবজি নিয়ে। নিজের ফুলকপির জমিতে সার ছিটাতে ছিটাতে
তিনি বলেন, এবার দেড় বিঘা জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করেছেন। আগামী ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে এসব সবজি বাজারে তোলার আশা করছেন তিনি।
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এমএ মান্নান বলেন, চলতি মৌসুমে জেলার পবা উপজেলায় ১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আগাম জাতের সবজি। বাজারের চাহিদা, উৎপাদন খরচ ও সম্ভাব্য বিক্রিমূল্য বিবেচনা করে কৃষকেরা ফসল নির্বাচন করছেন। তিনি বলেন, ‘আগে কৃষি ছিল বাঁচার জন্য। এখন কৃষি হচ্ছে ব্যবসার জন্য।’ আগাম সবজি চাষে কৃষকদের উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রাসায়নিক বালাইনাশক ব্যবহার করলেও অনুমোদিত মাত্রা মেনে চলার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে। শীত আসার আগেই সবজি বাজারে তুলে বাড়তি দাম পাওয়ার চেষ্টা এখন পবার অনেক কৃষকের। আর সেই চেষ্টায় মোশাররফ হোসেনের সাফল্য অন্য কৃষকদেরও আগাম সবজি চাষে উৎসাহিত করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহীর উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ৬ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগাম জাতের সবজি গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ২০০ হেক্টর জমিতে বেশি আবাদ হয়েছে।









