ধান কাটার শ্রমিকের অভাবে শত শত হেক্টর জমির ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। প্রতি বছরই নাটোরের বিভিন্ন উপজেলাসহ রাজশাহী, বাঘা, রংপুর ও গাইবান্ধা থেকে শত শত শ্রমিক আসে ধান কাটার জন্য। তারা ধান কাটা থেকে শুরু করে গরু-মহিষের গাড়িতে করে বাড়িতে ধান পৌঁছে দেওয়াসহ ধান মাড়াই পর্যন্ত সব করেন। কিন্তু এবার এই অঞ্চলে আসা শ্রমিকের সংখ্যা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম। ফলে তাদের মজুরিও অনেক। অন্যদিকে পাকা ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। এর ফলে জমিতেই নষ্ট হচ্ছে প্রচুর ধান।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণের উপ-পরিচালক আলহাজউদ্দিন জানান, এবছর ধানের ফলন ভালো হয়েছে। জেলার ৫৬ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান হয়েছে।
সরেজমিনে জেলার সদর উপজেলার বাকশোর,ভাতুরিয়া,নওপাড়া বিল, নলডাঙ্গা উপজেলার হালতি বিল, সিংড়া উপজেলার কলম, তাজপুর বিলসহ বড়াইগ্রাম,লালপুর,বাগাতিপাড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলার বিভিন্ন বিলের শত শত হেক্টর জমিতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ধান। এগুলোর মধ্যে মিনিকেট, হাইব্রিড, জিংক-৬৪, জিরা, রুপসী।
সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের হুলহুলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ দাবি করেন, তিনি প্রায় ২০ বিঘা জমিতে মিনিকেট ধান চাষ করেছিলেন। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক শঙ্কটের কারণে তিনি এখন পর্যন্ত ২ বিঘা জমির ধানও কাটতে পারেননি। গত বছর তাকে ধান কাটার জন্য মণপ্রতি ৪-৫ কেজি হারে মজুরি দিতে হয়েছে। কিন্তু এবার মণ প্রতি ১৫ কেজি করে ধান চাচ্ছেন শ্রমিকরা। না দিলে কাজ করতে রাজি হচ্ছেন না।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,এবার বিঘাপ্রতি ২০-২২ মণ ধান হলেও ধান কাটার মজুরি পরশোধ করতে এক-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে। এরপর আবার গাড়ি ভাড়া দিতে হচ্ছে মণপ্রতি ৩ কেজি করে। ধান মাড়াইয়ে দিতে হচ্ছে মণপ্রতি দেড় কেজি করে। অন্যদিকে বর্তমানে ধানের বাজার মূল্য মন প্রতি ৭শ’ থেকে ৭৫০ টাকা। এই মূল্যে ধান বিক্রি করে তিনি খরচের টাকাই তুলতে হিমশিম খাবেন বলে জানান।
নলডাঙ্গা উপজেলার হালতি বিল এলাকার খোলাবাড়িয়া বাজারে গিয়ে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাসহ সরকারি ক্রয়কেন্দ্র খোলার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নিতে এসেছেন।
রাজশাহীর বাঘা এলাকা থেকে খোলাবাড়িয়া গ্রামে মোষের গাড়ি নিয়ে আসা আব্দুল গফুর জানান, গত বছর ধানের দাম বেশি ছিল। ফলে অল্প ধান বিক্রি করেই মজুরি উঠে আসতো। বর্তমানে ধানের দাম কম তাই মজুরি উঠানোর জন্য বাধ্য হয়েই বেশি ধান নিতে হচ্ছে। রংপুর থেকে ধান মাড়াইয়ের হোফার নিয়ে আসা লায়েফ আলীও একই কথা বললেন।
এছাড়া ধান বিক্রির সময় মধ্য সত্ত্বভোগীদের অত্যাচারের কথা জানিয়ে শুকুর আলী নামে এক কৃষক বলেন,‘গত বছর অন্যাদের সঙ্গে ধান নিয়ে জেলা খাদ্য গোডাউনে বিক্রি করতে গিয়েছিলাম। গোডাউন কর্মকর্তারা আমার ধান দেখে অযথাই বিভিন্ন দোষ ধরে ধান কিনল না। এসময় অন্য কৃষকদের সঙ্গে আমিও ধান নিয়ে বেকায়দায় পরেছিলাম। কিছুক্ষণ পর এক লোক সেই ধান সরকারি রেটের চেয়ে মণপ্রতি ১শ টাকা কমে কিনে নেন। পরে আমাদের সামনেই তা গোডাউনে দিয়ে দিলেন।’
বিষয়টি সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে নলডাঙ্গার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ওমর আলী জানান,প্রত্যেক কৃষককে কৃষি কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের ব্যাংক একাউন্টও খুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়মানুযায়ী প্রত্যেক কৃষকই কৃষি কার্ড দেখিয়ে সরকারি গোডাউনে ধান বিক্রি করতে পারার কথা। তবে এ ব্যাপারে গোডাউন কর্মকর্তারাই ভালোও বলতে পারবেন।
আরও পাড়তে পারেন: প্রভাব খাটিয়ে ড. ইউনূসকে ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার পাইয়ে দিয়েছেন হিলারি
নাটোর সদর উপজেলার ফুড কন্ট্রোলার জগদিশ চন্দ্র সরকার কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে জেলা প্রশাসকই জেলা ক্রয় কমিটির সভাপতি। তার নির্দেশনানুযায়ী প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধানসহ অন্যান্য ফসল কেনার কথা।
জেলা প্রশাসক খলিলুর রহমান জানান,কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ফসল ক্রয় করাই সরকারের উদ্দেশ যাতে কৃষকরা ফসলের ন্যায্য মূল্য পান। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। আর আগামীতে সরকারি নির্দেশনা পেলে ধান কেনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কমিটির সদস্যদের এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বলবেন। কৃষকরা যাতে কোনও ক্রমেই ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত না হন সে ব্যাপারে তিনি মনিটোরিং করবেন বলে জানান।
আরও পড়তে পারেন: রংপুরে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১২
/জেবি/







