ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তাসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি কমতে থাকায় কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা-পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতি হয়েছে। তবে ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ও ধরলার সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সরেজমিনে বন্যা-কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বন্যার্তদের ভোগান্তি এতটুকু কমেনি। এর মধ্যে দিনের চেয়ে রাতের ভোগান্তি আরো অসহনীয়। পরিস্থিতির শিকার হয়ে গবাদি পশুর সঙ্গে ঘুমানোর জায়গা ভাগাভাগি করে নিতে হচ্ছে অনেককেই। তাদের অভিযোগ, দুই সপ্তাহ পার হলেও তাঁরা এখনো কোনো ত্রাণ কিংবা চিকিৎসা-সহায়তা পাননি।
বানভাসিরা কীভাবে রাত পার করছেন-তা দেখতে বাংলা ট্রিবিউন যায় সদর উপজেলার পাঁচগাছী ও যাত্রাপুর ইউনিয়নের পাকা-রাস্তা ও বাঁধের ধারে।
রবিবার (৩১ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টায় ধরলা ব্রিজ পার হয়ে হাতের ডানে মোড় নিয়েই যাত্রাপুর সড়ক। একটু এগোতেই চোখে পড়ে রাস্তার দু’ধারে পলিথিন আর চটের ছোট ছোট ছাউনি। একটি ছাউনিতে পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আব্দুল গফুর। পাশের ছাউনিগুলোতে আছে সফিকুল, আব্দুল আজিজ’সহ আরো কয়েকজনের পরিবার। তবে সবগুলো পরিবারের সঙ্গেই আছে একাধিক গবাদি পশু।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় ছাউনির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আব্দুল গফুর, সফিকুল ও আব্দুল আজিজের। এত রাতে বাইরে দাঁড়িয়ে কেন-এমন প্রশ্ন করতে সবার প্রায় একই উত্তর, ‘ভিতরে বৌ-বাচ্চা আর গরু-ছাগল রাখছি। সবাইরে নিয়াই চিন্তা হয়।’ আব্দুল আজিজ জানান, তাঁর বাড়ি থেকে এখনও পানি নামেনি। ফলে তিনি বাড়ি ফিরতে পারছেন না।
কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে চোখে পড়ে রাস্তার দুই ধারে আরও সারি-সারি ছাউনি । প্রায় প্রতিটি ছাউনিতেই বানভাসি মানুষের সঙ্গে আছে গবাদি পশু। ঝাকুয়াপাড়া গ্রামের দারগা আলীর অভিযোগ, তাঁর মেয়ে সুমি (৭) কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। কিন্তু চিকিৎসার জন্য কোনো সহায়তা পাননি তিনি। কোনো ত্রাণও পাননি।
পাঁচগাছী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের বারান্দায় রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন ২৫ থেকে ৩০ জন। সবাই বানভাসি। তাদেরই একজন তারামনি (৫৫)। ভিক্ষা করে খান। ছেলে, ছেলের বউ আর নাতিদের নিয়ে ১২দিন ধরে পরিষদের বারান্দায় রাত কাটাচ্ছেন। বন্যা শুরুর পর থেকে ভিক্ষাও করতে পারছেন না। এই দুই সপ্তাহে একবার ত্রাণ সহায়তা পেলেও শেষ হয়েছে তিন দিন আগেই। এখন চলছেন কীভাবে-জানতে চাইলে বলেন, ‘আল্লায় চালাইতেছে’। সেখানে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, নব-নির্বাচিত স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান তাদের দেখতে আসলেও কোনো সহায়তা দেননি। কারণ, তিনি এখনো দায়িত্ব বুঝে নেননি। আর বর্তমান দায়িত্বে থাকা চেয়ারম্যান আমির আলী তাদের দেখতেও যাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে চিলমারী উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে এক স্কুল ছাত্রসহ দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে রবিবার (৩১ জুলাই) স্কুল ছাত্র নাজিমের মৃত্যু হয় (১৫) ফুটবল খেলতে গিয়ে। আর মাছ ধরতে গিয়ে মৃত্যু হয় ওসমান মিয়ার (৫৫)। চিলমারী থানার ওসি মো. মজনুর রহমান তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জেলার চার শতাধিক চরসহ নিম্নাঞ্চলের বসতভিটা থেকে পানি না নামায় ঘরছাড়া মানুষজন। কেবল সদর উপজেলাতেই ৪১ হাজার পরিবারের দুই লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। টানা দুই সপ্তাহ ধরে বন্যার কারণে সেখানে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদি পশুর খাবারও নেই। দুর্গত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত নানা রোগ।
যদিও কুড়িগ্রাম জেলার নবনিযুক্ত সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলামের দাবি, তাদের মেডিকেল টিম ঠিকঠাক কাজ করছে। কোথাও কোনো সমস্যা নেই।
/এআরএল/
আপ:এইচকে
আরও পড়ুন: গাইবান্ধায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, বাড়ছে দুর্ভোগ







