নীলফামারীতে বোরো ধানের বীজতলা নিয়ে কৃষকেরা আতঙ্কে রয়েছেন। শীতের কারণে বোরোর বীজতলাগুলো লালছে বর্ণ ধারণ করছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে জেলার ছয় উপজেলার কৃষকেরা বলছেন, ‘প্রতিষেধক দিয়েও কোনও কাজ হচ্ছে। কিছুতেই বীজতলা তরতাজা হচ্ছে না। বীজতলার এমন দশায় বোরো আবাদ নিয়ে আমরা আতঙ্কে রয়েছি।’
জেলা সদরের টুপামারী ইউনিয়নের চৌধুরি পাড়া গ্রামের কৃষক খোকন মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শৈত্য প্রবাহের কারণে বীজতলার এমন দশা, পর্যাপ্ত রাসায়নিক সার ও ওষুধ ছিটিয়েও আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে চারা কিনে অসময়ে বোরো আবাদ করতে হবে। তাতে খরচ বাড়বে, কিন্তু ফল আশারনুরূপ হবে না।’
জেলা সদরের পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জিয়াউর রহমান জিয়া (৪৫) এবার তিন বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করবেন বলে জানান।
তিনি বলেন,‘বোরো চাড়াগুলোর বয়স হয়েছে প্রায় ৩৮ দিনের ওপরে। কিন্তু বীজতলাগুলো মরতে শুরু করেছে।’
মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি) সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বীজতলাগুলো লালচে হয়ে গেছে। আবার কোথাও দেখা গেছে, কচি চারাগুলো খড়ের মতো শুকিয়ে গেছে। কৃষকদের বীজতলার জন্য বাড়তি শ্রম ও পরিচর্যা করতে দেখা গেছে।
একই গ্রামের কৃষক হরিকেশর রায় (৪৫) বলেন,‘রোয়া গারিবার (রোপণ) সময় হইল, এলা বিছন মরেছে। পালা (কুয়াশা) কাটেবার মেলা ওষুধ দিনো তাহো বিছন মরেছে বাহে। বোধ হয় (মনে হয়) এলা বিছন কিনি হামাক আবাদ করিবার নাগিবে।’
জেলা সদরের গোড়গ্রাম ইউনিয়নের মাঝপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, বীজতলার করুন অবস্থা। দুই কৃষি শ্রমিককে দেখা যায় জমিতে রোপণের জন্য বেছে বেছে বীজতলা থেকে চারা তুলছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তাদের একজন ইব্রাহিম আলী (৩৫) বলেন, ‘ছয় জনের দল করে তিন বিঘা জমিতে রোয়া (চারা) লাগানোর চুক্তি নিছি। বিছনের যে অবস্থা তাতে আমার লোকসান হবে। এবার দেখছি কাম আগাচ্ছে না। মরা বিছন (বোরো বীজ) বেছে ফেলতে হচ্ছে। এতে অনেক সময় লাগছে।’
এদিকে, সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া কাছাড়ী গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫৭) এবার ২ বিঘা জমিতে বোরা আবাদ করবেন জানিয়ে বলেন,‘একে তো শীতে বিছন নষ্ট হচ্ছে। তার উপর ওই নষ্ট বিছন তুলবার জন্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও পাওয়া যায়, তাও আবার চড়া মজুরি চাওয়ায় লোক নেওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন,‘জমি তৈরি করে শ্রমিকের অভাবে ফেলে রেখেছি। গতবার চারা রোপণে বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে ছয়শ টাকা, এবার সেখানে এক হাজার টাকা লাগছে।’ বিছন নষ্টের কারণে বাছাই করে তুলতে সময় লাগছে বলে তিনি জানান। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি হচ্ছে।
একই ইউনিয়নের চড়চড়াবাড়ী গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম (৩৮) বলেন,‘এলাকার সব বীজতলা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ওই চারা রোপণ করে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। তারপরও আমারা নিরুপায়। তাই ওই চারা রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ‘এবার জেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৪ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে। এজন্য চার হাজার ৯৭২ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। এরইমধ্যে কৃষকরা জমিতে বোরো রোপণ শুরু করেছেন।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষকরা কোমর বেঁধে বোরো চাষে নামলেও বীজতলা ক্ষতি হওয়ার কারণে অনেকেই হোঁচট খাচ্ছে। তবে, আশা করি দুই একদিনের মধ্যে শীত কেটে যাবে। শীতের কারণেই এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. আফতাব হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবছর অতিমাত্রায় শীত পড়ায়, আমরা উদ্বিগ্ন। কোল্ড ইঞ্জুরির কারণে বোরো বীজতলা লালচে বর্ণ ও সাদা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের মাঠে সালফারযুক্ত ওষুধ ছিটানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে একটু রোদ উঠলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, এ ছাড়াও, বীজতলায় জিপসাম ও ইউরিয়া দিতে বলছি। শীত অনেকটাই কেটে গেছে, আর দুই, এক দিনের রোদ পেলেই চারা সবুজ হয়ে যাবে। আর সমস্যা থাকবে না। উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে আছেন, তারা পাড়া মহল্লায় বীজতলা দেখাশুনা করছেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন: বাড়ি ফিরেছেন আইভী








