দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলার সরকারি-বেসরকারি ১০৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৯টিতেই শহীদ মিনার নেই। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনও কোনোটিতে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার বানিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। আবার কোনও প্রতিষ্ঠানে দিবসটি পালনই করা হয় না।
দেশ স্বাধীন হওয়ার এতদিন পরও শহীদ মিনার নির্মিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অনেকেই জানান, একটা উপজেলার বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার না থাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেই শিক্ষার্থীরা ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারে না। এ কারণে শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলনের গুরুত্বও অনুধাবন করতে পারছে না।
উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, হাকিমপুরে ৪৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩টি কলেজ, ১১টি দাখিল মাদ্রাসা, ৪টি ফাজিল মাদ্রাসা, একটি আলিম মাদ্রাসা ও ১৯টি কিন্ডার গার্টেন রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫টিতে শহীদ মিনার আছে। ওই ৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো– ২নং বোয়ালদাড় ইউনিয়নের বোয়ালদাড় উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ, খাট্রাউছনা উচ্চ বিদ্যালয় এবং আলীহাট ইউনিয়নের জাংগই উচ্চ বিদ্যালয়, মনশাপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কোকতাড়া উচ্চ বিদ্যালয়।
হাকিমপুর উপজেলা সদরে ৬টি বিদ্যালয় ও একটি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে একটিতেও নেই শহীদ মিনার। এমনকি সদরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ বাংলাহিলি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজেও নেই শহীদ মিনার। এছাড়া সদরের বাংলাহিলি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সদ্য জাতীয়করণ হওয়া হাকিমপুর ডিগ্রি কলেজেও শহীদ মিনার নেই।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরা জানান, নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার না থাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তারা উপজেলা পরিষদ চত্বরে থাকা শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনেক শিক্ষার্থী জানান, তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার বানিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। আবার অনেকে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে দিবসটি পালনই করা হয় না।
এ ব্যাপারে বাংলাহিলি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ রকিব উদ্দিন মণ্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শহীদ মিনার নেই, একথা সত্য। তবে আমরা শহীদ মিনার স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছি। এটা খুব দরকার।’
এতদিনেও কেন বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার উপজেলা পরিষদে অবস্থিত, যা বিদ্যালয়ের পাশেই। বাংলাহিলি পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজে আলাদা শহীদ মিনার স্থাপন করা হলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লোকজনের উপস্থিতি কমে যাবে। এ কারণে শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়নি।’
হাকিমপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল মান্নান মণ্ডল বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় কলেজ প্রাঙ্গণে শহীদ নির্মাণ করা হয়নি। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।’
উপজেলার মনসাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মাহফুজার রহমান বলেন, ‘সরকারি আদেশ অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার থাকা বাধ্যতামূলক। সেজন্য ২০১০ সালে স্কুল প্রাঙ্গণে আমরা শহীদ মিনার নির্মাণ করি।’
উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা লায়লা আরজুমান জানান, তাদের স্কুলে শহীদ মিনার না থাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পাশের ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে থাকা শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
হাকিমপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শরিফা আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উপজেলার বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শহীদ মিনার নেই। তবে আমরা শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য শিক্ষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। সরকারি বরাদ্দ পাওয়ারও চেষ্টা করছি।’
হাকিমপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম প্রামাণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উপজেলার মাত্র ৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার রয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নেই এ শহীদ মিনারগুলো নির্মাণ করেছে ওই ৫ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বাকি সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও যাতে এভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ করে সেজন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানদের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।’








