এক পা নেই ৮০ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল জব্বারের। উপজেলার লাখো মানুষের মত তিনিও প্রত্যাশায় ছিলেন কবে একটি সেতু হবে, কবে চলতে পারবেন জেলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। স্বপ্ন পূরণের দিনে তাই হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার হেঁটে তিনিও এসেছেন। তিনি বলেন, ‘সেতু নয়, শেখ হাসিনা যেন প্রকৃতির বন্দি দশা থেকে স্বাধীনতা দিলেন আমাদের।’
শনিবার (২৮ এপ্রিল) বিকাল সাড়ে চারটায় যখন সেতুর প্রবেশ দ্বার উন্মোচন করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আব্দুল জব্বারের মত হাজারো নারী পুরুষ আর শিশুদের চোখে তখন আনন্দের আলোকছটা খেলা করছিল। কয়েক যুগের লালিত স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেখল সবাই। প্রবেশ দ্বার খোলার সঙ্গে সঙ্গে ধরলা নদী দ্বারা জেলার মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন সীমান্তবর্তী ফুলবাড়ী উপজেলার লাখো মানুষের স্বপ্ন পূরণ হলো, কয়েক যুগ ধরে নদী পারাপারে বিড়ম্বনা আর ভোগান্তির অবসান হলো।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কুলাঘাটে (বড় ঘাট) ধরলা নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে দ্বিতীয় ধরলা সেতু। প্রায় ১৯২ কোটি টাকা ব্যায়ে এলজিইডির অধীনে বাস্তবায়িত ১৯টি স্প্যান বিশিষ্ট ৯৫০ মিটার পিসি গার্ডারের এই সেতুর কাজ গত বছর ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে। দীর্ঘ তিন মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকলেও জনগণের যাতায়াতের সুবিধার্থে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতিক্রমে শনিবার (২৮ এপ্রিল) সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাফর আলী এবং পুলিশ সুপার মো. মেহেদুল করিম সহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনীতিক ব্যক্তিরা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত জনগুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় ধরলা সেতুর বাস্তবায়নের ফলে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার জনগণ, বিশেষ করে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হবেন। বিভাগীয় শহর রংপুরসহ দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সহজ হবে দেশের উত্তর-পশ্চিমের এই অঞ্চলের মানুষের। এ অঞ্চলের কৃষি ও বাণিজ্যের প্রসারে বাড়তি গতি আনবে এই সেতু। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার কৃষিজাত পণ্য পরিবহনে জটিলতাও কমবে এই সেতুর ব্যবহারে। সেতুটি পণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভুরুঙ্গামারীর বঙ্গসোনাহাট স্থলবন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মালামাল পরিবহন অনেক সহজ হবে। এছাড়া, বঙ্গসোনাহাট স্থলবন্দর হয়ে ফুলবাড়ীর দ্বিতীয় ধরলা সেতু দিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টারস (আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও অরুণাচল) রাজ্যগুলোর সঙ্গে পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও কমবে বহুলাংশে। এসব রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংরাবান্ধা হয়ে কলকাতার যোগাযোগও অনেক সহজ হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত ও বাস্তবায়িত এ প্রকল্পটি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি উত্তর ধরলার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিশিষ্টজনেরা।
উপজেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল ওয়াহেদ মিয়া। ব্যবসায়ী জীবণে পণ্য পরিবহণে নানা ভোগান্তির শিকার তিনি। বাইরের জেলা থেকে যেকোনও পণ্য পরিবহণ করতে জেলা শহর ও নাগেশ্বরী উপজেলা হয়ে অতিরিক্ত পথ পারি দিতে হত। সেতু চালু হওয়ায় এখন সব ভোগান্তি থেকে রেহাই পাবেন তিনি। জানান, ‘স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বন্যার সময় পণ্য পরিবহণে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। আজ থেকে সকল ভোগান্তির অবসান হলো।’
ফুলবাড়ী শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের মিয়া পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান জানান, একটি সেতুর অভাবে আমাদের এলাকার মানুষ অনেক সম্ভাবনাময় হওয়ার পরও পিছিয়ে ছিল। আজ থেকে এ এলাকার মানুষ নতুন পথে নুতুন উদ্যোমে যাত্রা শুরু করলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ অবদান ভোলার নয়, আমরা চিরকৃতজ্ঞ।
সেতু প্রাঙ্গনে উপস্থিত শিমুলবাড়ি ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ দ্বিতীয় ধরলা সেতুর বাস্তবায়ন ও তা যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়াকে নিজের জীবনের দ্বিতীয় বড় আনন্দের মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘৭১ এর স্বাধীনতার পর এটি আমার জীবনের সেরা আনন্দ। বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমরা যুদ্ধ করে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির বন্দিত্ব থেকে দেশ স্বাধীন করেছি আর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আমাদের প্রকৃতির বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতা দিলেন।’ ’
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাফর আলী জানান, ‘কুড়িগ্রামের মানুষের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দৃষ্টির ফসল এই সেতু। রমজান, ঈদ এবং স্থানীয় জনগণের যাতায়াতে দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে জেলা সমন্বয়ক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলো। আশা করি ঈদ-উল ফিতরের আগেই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।’







