গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লীতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনার দুই বছর পার হলেও এখনও সুষ্ঠু বিচার পায়নি তারা। এমনকি ওই সময় দখল হওয়া সম্পত্তিও ফিরে পায়নি সাঁওতালরা। হামলার পর থেকেই অস্থায়ী জায়গায় ঝুঁপড়ি ঘর বানিয়ে দুর্বিসহ দিন কাটাচ্ছে তারা। অনেকে জীবিকার তাগিদে অন্য স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। হামলার শিকার অনেকে বেঁচে আছেন শরীরে ক্ষত চিহ্ন নিয়ে। তাদের দাবি, দ্রুত এই হামলা মামলার বিচার শেষ করে বাপ-দাদার সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া।
২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ খামারের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে সাঁওতালদের বসতিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পুড়িয়ে ফেলা হয় কয়েকশ’ বাড়িঘর। এসময় পুলিশ, চিনকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতাল-বাঙালিদের সংঘর্ষে পুলিশসহ অহত হন অন্তত ৩০ জন। পুলিশের ছোড়া গুলিতে মারা যান শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ নামে তিন সাঁওতাল। ঘটনার দুই বছর পার হলেও সেদিনের তাণ্ডবের কথা আজও ভুলতে পারেনি সাঁওতালরা।
হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষে দু’টি এবং পুলিশ ও চিনিকল কর্তৃপক্ষ ৮টি মামলা করে গোবিন্দগঞ্জ থানায়। কিন্তু ঘটনার দুই বছরেও এসব মামলার একটিরও তদন্ত কাজ শেষ করতে পারেনি পুলিশ। এছাড়া মামলার ঘটনায় স্থানীয়দের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জড়িত থাকার প্রমাণ পায় বিচারিক তদন্ত কমিটি। এছাড়া হামলায় জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বদলি করা ছাড়া কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সরেজমিনে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, সব হারিয়ে উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতাল পরিবারগুলো মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছে। ছোট-ছোট টিনের ছাপড়া ও ত্রিপলের তাঁবুতেই বসবাস করছেন শতাধিক সাঁওতাল পরিবার।
সেখানে গিয়ে কথা হয়, বসবাসরত সাঁওতালদের সঙ্গে। মাদারপুরে আশ্রয় নেওয়া সাঁওতাল রমিলা টুডু বলেন, ‘বাপ-দাদার সম্পত্তি উদ্ধার আন্দোলনে নেমে সেই জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছিলাম। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে দুই মেয়েকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটছিল। হঠাৎ হামলার ঘটনার সব হারিয়ে নিঃস্ব হতে হয়েছে। সেই ঘটনার দুই বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত বিচার পাইনি। ফেরত পাইনি সম্পত্তি।’
জয়পুরপাড়ার রাজ হেমব্রম বলেন, ‘আগুনে সব হারিয়ে ঝুঁপড়ি ঘরে বসবাস করছি। এখনেও খাবার কষ্টে দিন কাটে। তারপরেও সেই হামলার ঘটনা বুকে তাড়া করে। ঠিকভাবে হাট-বাজার করতে পারি না। নানা হুমকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অথচ ঘটনার কোনও বিচার হলো না আজও । জমি ফেরত দেওয়ারও কোনও উদ্যোগ নেই প্রশাসনের।’
হামলায় গুলিতে আহত চরেন সয়েন বলেন, ‘হামলার সময় পুলিশের গুলিতে আহত হই। শরীরে গুলির ক্ষত এখনেও শুকায়নি। ঘরে খাবার জোটে না ঠিকভাবে, তারওপর এখনও ওষুধ কিনতে হয়। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দুই বছর ধরে অনেক কষ্টেই দিন কাটাতে হচ্ছে।’
ত্রাণ কমিটির সভাপতি বার্নাবাস বলেন, ‘ঘটনার পর সরকারি-বেসরকারিভাবে সহায়তা পেলেও এখন আমাদের কেউ খোঁজ নেয় না। কাজ না থাকায় কোনোরকম খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। তাছাড়া দুই বছর পার হলেও সুষ্ঠু বিচার কিংবা সম্পত্তি ফেরতের আশ্বাস ছাড়া বাস্তবায়ন হয়নি।’
এদিকে, হামলা ও হত্যা ঘটনায় স্বপন মুরমু বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন। কিন্তু সেটি সাঁওতালদের পক্ষে নয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ঘটনার ৪ সপ্তাহ পর থমাস হেমব্রম বাদী হয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইউপি চেয়ারম্যান, মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ৩৩ জন নামীয় ও অজ্ঞাত ৫০০-৬০০ জনকে আসামি করে অভিযোগ দাখিল করেন। কিন্তু অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরি হিসেবে গ্রহণ করে গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ। এছাড়া হামলা, ভাঙচুর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে সাঁওতালদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও চিনিকল কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে বিভিন্ন সময় আরও ৮টি মামলা দায়ের করে। স্বপন মরমু বাদী হয়ে যে মামলা করেছিল তারপর থেকে লাপাত্তা হন তিনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও চেষ্টা করেও তার খবর পায়নি।
মামলার বাদী থমাস হেমব্রন বলেন, ‘হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নিঃস্ব অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। নিহত তিনজন ও আহতদের পরিবারগুলোর অবস্থাও করুণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত কাজ শেষ করে, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণসহ দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে।’
সাঁওতালদের ওপর হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচারিক তদন্ত কমিটি ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গাইবান্ধা ইউনিটের ইনচার্জ আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘মামলার পর থেকে দুই বছরে ২৫ জন আসামিকে গ্রেফতার, লুটপাট মালামাল উদ্ধার, আলামত, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট সংগ্রহ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্তসহ অনেকের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে এক আসামি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। তবে নতুন করে তদন্ত কর্মকর্তা নির্ধারণ ও ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়ায় তদন্ত শেষ করতে কিছুটা সময় লাগলেও চেষ্টা অব্যাহত আছে। দ্রুতই তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।’
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ পুনর্বাসন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই উচ্ছেদ হওয়া সাঁওতালদের চাল, ডাল, শীতবস্ত্র, ঢেউটিন বিতরণ করা হয়। ভিজিডি, ভিজিএফ ও কর্মসৃজন প্রকল্পে তাদের কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন ব্যাবস্থা, নিহত আর আহতদের পরিবারকে বিভিন্ন সময় সাধ্যমতো সহায়তা করা হয়। বরাদ্দ পাওয়া গেলে আগামীতেও তাদের সহযোগিতা করা হবে।’
সাঁওতাল পল্লীতে হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধেও। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সবসময় সাঁওতালদের পাশে ছিলাম। আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসনসহ বিভিন্নভাবে তাদের সহযোগিতা করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়।’
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম মেহেদী হাসান বলেন, ‘মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ায় আশ্রয় নেওয়া সাঁওতালদের বিষয়ে পুলিশের সবসময় নজরদারি রয়েছে। এছাড়া ৬ নভেম্বর সাঁওতাল হত্যা দিবসকে ঘিরে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের সভা-সমাবেশ সম্পন্ন করতেও পুলিশ টহলসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।’
এদিকে, ৬ নভেম্বর দিনটিকে ‘সাঁওতাল হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করেন স্থানীয় সাঁওতালরা। দিবসটি উপলক্ষে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ায় স্মরণসভা ও সমাবেশসহ মঙ্গলবার দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। সাহেবগঞ্জ ভূমি উদ্ধার কমিটি এই কর্মসূচির আয়োজন করে।








