দিনাজপুরের হিলিতে সরকারিভাবে খাদ্য গুদামে বোরো মৌসুমের ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। বাজারে ধানের দাম বেশি পাওয়ায় গুদামে ধান দিতে আগ্রহী নন কৃষক। তেমনি বাড়তি দামে ধান ক্রয় করে চালের পড়তা বেশি পড়ায় চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরও খাদ্য গুদামে চাল সংগ্রহ করেননি মিলাররা। এদিকে ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সময় বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে খাদ্য গুদাম কতৃপক্ষ।
হিলির ছাতনি গ্রামের কৃষক মোসলেম উদ্দিন ও তোফাজ্জল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এবার খোলা বাজারে ধানের দাম ভালো পাওয়ায় সেখানেই ধান বিক্রি করা হয়েছে। সরকার ১ হাজার ৪০ টাকা মণ দরে ধান কিনলেও ধান শুকানো, ফ্যানিং করা, ময়েশ্চারসহ ধান দেওয়ার পরও টাকা উঠাতে গিয়ে নানা রকম ঝামেলা পোহাতে হয়। আর আড়তদারদের নিকট ঝামেলা ছাড়াই মাঠ থেকে কাঁচা ধান কেটে নিয়ে বিক্রি করা যায়। তাই আমরা খাদ্য গুদামে ধান না দিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করেছি। প্রতি মণ ধান প্রকারভেদে ৯০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০ টাকা পর্যন্ত দাম পেয়েছি, টাকাও নগদ। এছাড়া সরকারি মূল্যের চেয়ে কিছুটা কম হলেও গুদামে ধান দিতে পরিবহন খরচ বেশি। আড়তদারদের কাছে দিলে নিকটবর্তী হওয়ার কারণে খরচ কম হয়। যার কারণে তালিকায় নাম উঠলেও অনেক কৃষক সরকারি গুদামে ধান দেননি।
হিলির শমসের হাসকিং মিলের সত্ত্বাধিকারী এমদাদুল হক ও শিরিন হাসকিং মিলের সত্ত্বাধিকারী সামসুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে ধানের ক্রয় মূল্য ১ হাজার ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু খোলা বাজারেও একই হারে ধান কেনাবেচা চলছে। বাজারে ধানের যে দাম তাতে চিকন ধান কিনে চাল করে গুদামে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। একমাত্র মোটা ধানই কিনে চাল করে গুদামে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু মোটা ধানের দাম বর্তমানে ৯০০ টাকা বা তার বেশি চলছে। তার ওপর ধান তেমন পাওয়াও যাচ্ছে না। ধান কিনে চাল করতে প্রতি কেজিতে ক্রাসিং, শ্রমিক, পরিবহনসহ অন্য সব খরচ মিলিয়ে আমাদের পড়তা পড়ছে ৩৮-৩৯ টাকা বা তার বেশি। খোলা বাজারে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪২-৪৪ টাকা কেজি দরে। কিন্তু সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ টাকা যা বর্তমান বাজার অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এর ফলে কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা লোকসান হবে। প্রথম দিকে কিছুটা কম ছিল। এই মূল্যে খাদ্য গুদামে চাল সরবরাহ করা কোনও ক্রমেই সম্ভব না। এতে অনেক টাকা লোকসান গুনতে হবে। বর্তমানে আমরা অসহায় অবস্থার মধ্যে আছি। সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি লাইসেন্স বাঁচানোর তাগিদে, কেউ কেউ চাল সরবরাহ করলেও অনেকে এখনও করতে পারেনি। সরকার যদি চালের দাম ও সময় একটু বাড়িয়ে দেয় সেক্ষেত্রে আমরা মিলাররা যেমন লোকসানের হাত থেকে রেহাই পাবো, তেমনি সরকারের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হবে।
হিলি খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা যোসেফ হাসদা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, গত ৬ জুন বোরো মৌসুমের ধান চাল সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধন করা হয়, যা চলে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। আজ পর্যন্ত ২৬ টাকা কেজি দরে ১ হাজার ৩৭৩ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫৮৪ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সিদ্ধ চাল ৩৬ টাকা কেজি দরে ৮১৩ টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪২৫ টন সংগ্রহ করা হয়েছে। আর আতপ চাল ৩৫ টাকা কেজি দরে ১৪৪ টন ছিল, যা অর্জিত হয়েছে। তবে শুনেছি যেহেতু ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি সেক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়বে। এখনও এ বিষয়ে কোনও নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি।
হাকিমপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, খোলা বাজারে ধানের ভালো দাম পাওয়ায় সরকারি খাদ্য গুদামে ধান দিতে কৃষকদের অনাগ্রহ দেখা গেছে। অপরদিকে ধানের মূল্য বেশি হওয়ায় চালের উৎপাদন খরচ বেড়ে লোকসানের আশঙ্কায় মিলাররা চাল সরবরাহ করছেন না। এতে করে বোরো মৌসুমের ধান চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যামাত্রা পূরণ হয়নি। তবে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরও কোন মিলার চাল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হন তাহলে নীতিমালা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।








