১০ বছরেও তামিল হয়নি গ্রেফতারি পরোয়ানা

লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর
১৮ নভেম্বর ২০২১, ১০:০০আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২১, ১৩:৪২

রংপুর পারিবারিক আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা ১০ বছরেও তামিল করেনি বদরগঞ্জ থানা পুলিশ। এ জন্য বদরগঞ্জ থানার ওসি হাবিবুর রহমান হাবিবকে সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত।

বদরগঞ্জ পারিবারিক আদালতের বিচারক মতিউর রহমান এসব আদেশ দিয়েছেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী ফারুক সরকার এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। একই সঙ্গে থানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের রেজিস্টার বইটি তলব করেছেন বিচারক। আদালতের আদেশ পালন না করায় কেন তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তারও ব্যাখ্যা চেয়েছেন আদালত।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুরের অরুননেছা গ্রামের মোজাফফর শাহের মেয়ে হাসনা বানু ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একই উপজেলার কাঁচাবাড়ি গ্রামের তার স্বামী তাজনার সরকারের বিরুদ্ধে খোরপোশ না দেওয়ার অভিযোগে পারিবারিক আদালতে মামলা করেন।

একইভাবে বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর গ্রামের মোজাম উদ্দিনের মেয়ে মনশেফা বেগম একই গ্রামের তার স্বামী ওয়াজেদ আলীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগে ২০১২ সালের মার্চ মাসে মামলা করেন। দুই মামলার আসামিরা আদালতে হাজির হননি। এ অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এই আদেশ ১০ বছরেও তামিল করেনি বদরগঞ্জ থানা পুলিশ।

আদালত সূত্র জানায়, মামলার নথি পর্যালোচনা করে বিচারক দেখেন, একাধিক পারিবারিক মামলায় আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। অথচ কোনও আসামি গ্রেফতার হয়নি। এর মধ্যে দুই মামলার পরোয়ানা তামিল করেনি বদরগঞ্জ থানা পুলিশ। এমনকি কেন তামিল করা হয়নি সে বিষয়ে প্রতিবেদনও দেয়নি।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ অক্টোবর থানায় তাগিদপত্র ইস্যু করে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যর্থতায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল না করা এবং ধার্য তারিখের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল না করায় ওসির কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।

আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বদরগঞ্জ থানার ওসি ব্যাখ্যা দেন, রেজিস্টার বই পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোনও গ্রেফতারি পরোয়ানা থানায় মূলতবি নেই। তার সময়ে এমন কোনও গ্রেফতারি পরোয়ানা থানায় যায়নি।

ওসির এমন ব্যাখ্যায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন আদালত। সেই সঙ্গে তার ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে আগামী ২২ নভেম্বর থানার পরোয়ানা তামিলের রেজিস্টার বইসহ আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার আদেশ দেন।

বিচারকের আদেশনামায় পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল অনুসারে যে তারিখের মধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলের জন্য দিন ধার্য থাকে, ওই তারিখের মধ্যে যদি পরোয়ানা তামিল করা সম্ভব না হয়, তাহলে ওসিকে ধার্য তারিখের সকালে পরোয়ানা তামিল করতে না পারার কারণ উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে হয়। আবার ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস অনুসারে আদালত পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জারি করতে বাধ্য পুলিশ। যৌক্তিক কারণে জারি করতে ব্যর্থ হলে আদালতের নির্ধারিত তারিখের আগেই কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিতে হয়।

আদালতের আদেশে আরও বলা হয়, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন অনুযায়ী আদালতের আদেশ প্রতিপালন করা প্রত্যেক পুলিশের দায়িত্ব। দায়িত্ব অবহেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

গ্রেফতারি পরোয়ানা থানায় না পাওয়ার বিষয়ে ওসির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা সঠিকভাবে থানায় গেছে কিনা তা নিশ্চিত হতে আদালতের সেরেস্তার সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার, নেজারতে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার বই পর্যালোচনায় দেখা যায়; আদালত থেকে সঠিকভাবে পরোয়ানা থানায় পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল ও ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারের সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, আদালত থেকে প্রাপ্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা গ্রহণ করার পর তা রেজিস্টারভুক্ত করতে হয়। পরোয়ানা তামিল না হওয়া পর্যন্ত কিংবা প্রত্যাহার হওয়া পর্যন্ত রেজিস্টারভুক্ত রাখতে হয়। এ অবস্থায় থানার ওই রেজিস্টার বই পর্যালোচনা ছাড়া ওসির ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।

গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল না হওয়ায় বিবাদীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন মর্মে আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিলে কোনও অনিয়ম কিংবা সমস্যা হয়েছে কিনা তা খুঁজে বের করে সমাধানের জন্য পুলিশ সুপার ও রংপুর রেঞ্জের ডিআইজিকে আদালতের আদেশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল না হওয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারা অনুসারে রংপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আদেশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।

গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল না করা বদরগঞ্জ থানার ওসির দায়িত্বহীনতা। এটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন আদালত।

বদরগঞ্জ পারিবারিক আদালতের বেঞ্চ সহকারী ফারুক সরকার বলেন, এই দুই মামলা ছাড়াও আরও ১৪টি পারিবারিক মামলায় আদালতের দেওয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল করছে না বদরগঞ্জ থানা পুলিশ। আসামিদের গ্রেফতারও করছে না। এ জন্য ওসিকে সশরীরে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আদালতের যেকোনও আদেশ থানার ওসিদের পালন করা দায়িত্ব। আইনগতভাবে ওসি বাধ্য। কিন্তু আদালতের আদেশকে অবজ্ঞা করা আদালত অবমাননার সামিল। এ জন্য আদালত ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেকোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিতে পারেন।

রংপুর আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী আরিফ ইসলাম বলেন, আদালতের আদেশ প্রতিপালন করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। দীর্ঘ ১০ বছরেও গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল না হওয়ার ঘটনা দুঃখজনক।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বদরগঞ্জ থানার ওসি হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, আমি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি নই। এটি আদালতের বিষয়।


/এএম/টিটি/
সম্পর্কিত
শিশু রামিসা হত্যা মামলাআসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
রামিসা হত্যা: সর্বোচ্চ সাজা চায় রাষ্ট্রপক্ষ, লঘুদণ্ডের দাবি আসামিপক্ষের
সর্বশেষ খবর
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদায়ন, ৩১ শিক্ষককে বদলি
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
খলিলুর রহমানকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী