‘ফেলানীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য বাড়িতে নিয়ে আসছিলাম। পরদিন বিয়ে হতো তার। কিন্তু বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ আমার নিরীহ মেয়েটাকে হত্যা করলো। মেহেদীর রঙের বদলে রক্তে লাল হলো আমার মায়ের শরীর। আমি এই হত্যার বিচার চেয়ে অনেক ঘুরেছি, মানবাধিকার সংস্থাসহ বহু জনের কাছে গেছি। এখন ১১ বছর হয়ে গেলো বিচার পেলাম না। বিচার পাইলে মেয়েটার আত্মা শান্তি পাইতো। আর কত অপেক্ষা করতে হবে?’
১১ বছর আগে সীমান্ত হত্যাকান্ডের শিকার মেয়ে হত্যার বিচার না পেয়ে এভাবেই আক্ষেপ প্রকাশ করেন ‘সীমান্ত কন্যা’ খ্যাত কুড়িগ্রামের কিশোরী ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম।
যে কারণে সীমান্তের সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া হয় না২০১১ সালের এই দিনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করার সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় কিশোরী ফেলানী। দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে থাকে ফেলানীর মৃত দেহ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারতের সীমান্ত ‘নীতি’। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের ‘বিচারের’ ব্যবস্থা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। বাহিনীর বিশেষ কোর্টে দুই দফা বিচারিক রায়ে খালাস দেওয়া হয় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে। রায় প্রত্যাখ্যান করে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেন ফেলানীর পরিবার। কিন্তু আজও সে রিটের শুনানি হয়নি।
ফেলানীর বাবা বলেন, ‘ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশনটি ২০২০ সালের ১৮ মার্চ শুনানির তারিখ থাকলেও তা হয়নি। করোনাকালে আর কোনও খোঁজখবর রাখিনি।’
‘ফেলানী হত্যার পর সরকারসহ বিভিন্ন সংগঠন খোঁজ নিলেও এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। আমার বাকি ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব বিপাকে আছি। পরিবারের কারও চাকরির ব্যবস্থা করলে দুই বেলা খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারতাম।’
আক্ষেপের পাশাপাশি প্রত্যাশা নিয়ে যোগ করেন নুর ইসলাম।
কী ঘটেছিল সেদিন: ৭ জানুয়ারির সেই দিনটিও ছিল শুক্রবার। ফেলানীর বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামে হলেও জীবিকার প্রয়োজনে ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম পরিবার নিয়ে থাকতেন ভারতে বঙ্গাইগাঁও গ্রামে। দেশে ফেলানীর বিয়ে দেবেন বলে ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি রাতের আঁধারে মেয়েকে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওয়ানা দেন নুর ইসলাম। ৭ জানুয়ারি ভোরে ফুলবাড়ির অনন্তপুর সীমান্তে কাঁটাতারের ওপর দিয়ে মই বেয়ে আসার সময় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলি এসে বিদ্ধ করে ফেলানীর দেহ। গুলিবিদ্ধ ফেলানী কাঁটাতারের ওপর ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তার নিথর দেহ কাঁটাতাঁরের ওপর ঝুলে থাকে দীর্ঘ সাড়ে ৪ ঘণ্টা।
কাঁটাতারে ফেলানীর ঝুলন্ত মরদেহের ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফেলানী হত্যার বিচার এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারতের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। বিএসএফের এ কোর্টে স্বাক্ষী দেন ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম ও মামা হানিফ। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফের বিশেষ কোর্ট। পরে রায় প্রত্যাখ্যান করে পুন:বিচারের দাবি জানায় ফেলানীর বাবা।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত খুবই জটিল২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আবারও আদালতে স্বাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। ২০১৫ সালের ০২ জুলাই এ আদালত আবারও আত্মস্বীকৃত আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। রায়ের পরে একই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর রিট শুনানি শুরু হয়। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি শুনানির দিন ধার্য হলেও শুনানি হয়নি । এরপর ২০১৯ এবং ২০২০ সালে কয়েকবার শুনানির তারিখ ধার্য হলেও এখন পর্যন্ত তা সম্পন্ন হয়নি ।
মেয়ে হত্যার বিচার না পেয়ে হতাশ ফেলানীর মা জাহানারা বেগম। তবে এখনও বিচারের দাবিতে অটল তিনি। তিনি বলেন, ‘ফেলানী হত্যার ১১ বছর হয়ে গেলো আজও বিচার পাইনি। আমি দুই দেশের সরকারের কাছে মেয়ে হত্যার সঠিক বিচার দাবি করছি।’
ফেলানী হ্যতাকান্ডের পর ফেলানীর পরিবারকে আইনি পরমর্শ দেওয়াসহ ফেলানীর বাবার সঙ্গে সাথে ভারতে একাধিকবার যান কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এস এম আব্রাহাম লিংকন। ফেলানী হ্যতাকাণ্ডের বিচারের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ফেলানী হত্যার রিটটি কার্যতালিকার তিন নম্বরে ছিল। নানা কারণে শুনানির ধার্য দিন পিছিয়ে গেছে। এখন করোনাকালে নিয়মিত শুনানি হয়তো সম্ভবপর নয়। তবে রিটটি নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। প্রত্যাশা করছি ভারতের আদালত দ্রুত রিট আবেদনটির শুনানি কার্যতালিকায় নিয়ে আসবে এবং একটি ইতিবাচক রায় দেবেন।’
ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পর সীমান্ত হত্যা উল্লেখযোগ্যহারে কমে গেছে জানিয়ে এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘ভারতের উচ্চ আদালতে আমরা বৃহত্তর স্বার্থে রিট করেছি। শান্তিপূর্ণ বর্ডার ব্যবস্থাপনাসহ পারিপার্শ্বিক অনেক বিষয় এখানে জড়িত রয়েছে। ফেলানী হত্যার ন্যায় বিচারের পাশাপাশি আমাদের প্রত্যাশা সীমান্ত হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোটায় নেমে আসুক। সীমান্তে যেন আর কোনও নিরপরাধ মানুষের প্রাণ না ঝরে।’
ফেলানীর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় আজ দুপুরে গ্রামের বাড়িতে মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করেছে তার পরিবার। নিরপরাধ ওই কিশোরীর পরকালীন শান্তির জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেছেন ফেলানীর বাবা-মা।









