কলিমউল্লাহর সাবেক পিএসের বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ

লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর
১০ মার্চ ২০২২, ২১:৪১ আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ২৩:৫৫

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর সাবেক একান্ত সহকারী (পিএস) আমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, জিনিসপত্র ক্রয়, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বাণিজ্য, টেন্ডার আহ্বান সংক্রান্ত শতাধিক কমিটির আহ্বায়ক হয়ে এসব টাকা লুটপাট করেছেন। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি এসব অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়নি। এ অবস্থায় তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন সংগঠন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রায় তিন মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন না আমিনুর রহমান। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর নেই। এরপরও লাখ টাকা মাসিক বেতন নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন অনুপস্থিতির ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গত চার বছরে টেন্ডার আহ্বান সংক্রান্ত শতাধিক কমিটির আহ্বায়ক থাকার কথা স্বীকার করেন আমিনুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সাবেক উপাচার্য আমাকে পছন্দ করতেন বলে এসব কমিটির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এতে দোষের কিছুই দেখছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি প্রশাসন দেখবে। আমি প্রশাসনকে জবাব দেবো।’

আমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

গবেষণা না করেও এমফিল ডিগ্রিকে পিএইচডি ডিগ্রিতে রূপান্তরিত করেছেন আমিনুর। এজন্য কোনও ছুটি নেননি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি দেখিয়ে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার হয়েছেন।

গত ৪ জানুয়ারি রাতের অন্ধকারে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তর প্রথম পর্বের পরীক্ষার মূল নম্বরপত্র এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষর ছাড়াই গোপনে দুই কর্মকর্তা ফল প্রকাশ করেন। দুই কর্মকর্তা হলেন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শামসুল হক ও নিখিল চন্দ্র বর্মন। 

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক জিনাত শারমিন বলেন, ‘আমি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির সদস্য। অথচ আমি ফল প্রকাশের বিষয়টি জানি না। কীভাবে-কারা এই অনিয়ম করেছে, তা তদন্ত করা দরকার।’ 

তৎকালীন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘যে কোনও পরীক্ষার ফল বিভাগের শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দফতরে আসার কথা। পর্যায়ক্রমে জুনিয়র থেকে সিনিয়রিটি মেইনটেন করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের স্বাক্ষর হয়ে ফল প্রকাশিত হওয়ার কথা। কিন্তু এই পরীক্ষার ফল প্রকাশের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। আমার (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক) স্বাক্ষরও নেওয়া হয়নি।’

এ ঘটনার জেরে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পদ থেকে মোরশেদ হোসেনকে সরিয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল হককে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ফল প্রকাশে অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখে পুনরায় ফল প্রকাশের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘অধিকার সুরক্ষা পরিষদ’ তৎকালীন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নাজমুল হককে ১৪ জানুয়ারি অবরুদ্ধ করে। পরদিন নাজমুল হককে বাদী করে তাজহাট থানায় একটি মামলা করান আমিনুর। এই মামলায় অবরুদ্ধকারীদের আসামি করা হয়েছে।

মামলার বিষয়ে নাজমুল হক বলেন, ‘আমি মামলা করতে চাইনি। এটি সাজানো ও মিথ্যা মামলা। আমিনুর রহমানের প্ররোচনায় মামলা করেছি। পরে সেটি প্রত্যাহার করেছি।’  

এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যারাই বিরোধিতা করছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে চাকরি থেকে বরখাস্ত ও হয়রানি করেন আমিনুর। 

সাবেক উপাচার্য কলিমউল্লাহ বছরের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে না আসার সুযোগে মূলত আমিনুর উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন তিনি। এসব অভিযোগ করেছেন ‘অধিকার সুরক্ষা পরিষদের’ নেতারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈধ নিয়োগ ও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন

কলিমউল্লাহ উপাচার্য থাকাকালে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার নামে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন আমিনুর। রংপুরে না আসা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতেন। তাও নির্দিষ্ট এক-দুটি পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতেন। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের আবেদন গ্রহণ, আবেদনপত্র গায়েব, টাকা নিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ভাইভা বোর্ডে ডাকা হতো আমিনুরের ইশারায়। ফলে কলিমউল্লাহর সময়ে কোনও যোগ্য প্রার্থী নিয়োগ পাননি। এসব নিয়োগের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে আমিনুর ও তার সহযোগীদের অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসবে। 

কেনাকাটা, টেন্ডার আহ্বানের মালামাল ক্রয়, সভা-সেমিনারসহ বিভিন্ন কমিটির নেতা

শতাধিক আহ্বায়ক কমিটির নেতা হয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আমিনুর। যার কোনও যোগ্যতা নেই, বিশেষজ্ঞ নন; কমিটির মাধ্যমে এমন ব্যক্তিকে নেতা বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আমিনুর।

পরিবহন পুলের টাকা লুটপাট

কলিমউল্লাহ চার বছর উপাচার্য থাকাকালীন বেশিরভাগ সময়ে পরিবহন পুলের দায়িত্বে ছিলেন আমিনুর। এ সময়ে গাড়ি মেরামত, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ভাড়ায় খাটানো থেকে শুরু করে তেল আর মেইনটেনেন্স খাতে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

ভায়রাকে শিক্ষক নিয়োগ

যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ভায়রাকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন আমিনুর। একই সঙ্গে দেড় বছরের মাথায় তাকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেতে সহায়তা করেছেন। 

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, ‘সাবেক উপাচার্য কলিমউল্লাহর ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন তার একান্ত সহকারী আমিনুর রহমান। কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আমরা লিখিত অভিযোগ দিয়ে বিচার চেয়েছি।’

বেরোবির ‘অধিকার সুরক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মতিউর রহমান বলেন, ‘সাবেক উপাচার্য কলিমউল্লাহর সব অনিয়ম-দুর্নীতির সহযোগী আমিনুর রহমান। তার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা অনেকবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এখন কিন্তু আমিনুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন না। তবে মাসে মাসে ঠিকই বেতন নিচ্ছেন। নিজেকে রক্ষা করতে এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। আমরা তার বিচার ও শাস্তি চেয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আমিনুর রহমান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা। তবে আমি অনেক কমিটিতে ছিলাম। নিয়োগ কমিটিতে ছিলাম বলে এসব অভিযোগ করেছেন অধিকার সুরক্ষা পরিষদের শিক্ষকরা।’ 

/এএম/
সম্পর্কিত
স্বাস্থ্য খাতকে ‘মাদার অব অল দুর্নীতি’ বললেন এমপি নাসের রহমান
ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ ৫ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে, বদলিই কি একমাত্র শাস্তি?
আসাদুজ্জামান নূর ও জ্যাকবের দুর্নীতির মামলায় প্রতিবেদন জমার দিন পেছালো 
সর্বশেষ খবর
সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ট্রেন্ড এড়ানো এত কঠিন কেন?
সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ট্রেন্ড এড়ানো এত কঠিন কেন?
মালদ্বীপকে হারিয়ে ফাইনালে ভারতের সঙ্গী বাংলাদেশ
মালদ্বীপকে হারিয়ে ফাইনালে ভারতের সঙ্গী বাংলাদেশ
আরও একদিন ছুটির দাবিতে সড়ক অবরোধ করলেন শ্রমিকরা
আরও একদিন ছুটির দাবিতে সড়ক অবরোধ করলেন শ্রমিকরা
প্রাচীন এই বীজের তেল নিয়ে নেট দুনিয়ায় এত মাতামাতি কেন?
প্রাচীন এই বীজের তেল নিয়ে নেট দুনিয়ায় এত মাতামাতি কেন?
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
ওআইসির কাশ্মীর প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
ওআইসির কাশ্মীর প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত