X
বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২২
২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

রমেকে ১৬ কর্মচারীর বদলিতেও থেমে নেই ‘সিন্ডিকেট চক্র’

লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৪:২২আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:০৭

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে রোগীদের জিম্মি করে ‘বকশিসের’ নামে ছয়-সাত গুন বেশি রোগী ভর্তি ফি আদায় এবং ট্রলিতে রোগীদের বহন করতো চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ‘সিন্ডিকেট’ আর ‘অসাধু চক্র’। এমনকি লাশ নামাতেও জোর করে টাকা আদায়সহ নানান অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে এমন অভিযোগে হাসপাতালটির ১৬ কর্মচারীকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বদলির আদেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এই আদেশ স্থগিতের জন্য সিন্ডিকেট চক্রটি বিভিন্নভাবে তদবির অব্যাহত রেখেছে। সেই সঙ্গে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে বুধবারও (২৮ সেপ্টেম্বর) ট্রলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপকর্ম অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর একই হাসপাতালের চিকিৎসক রাশেদুল আমিনের মাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে নিলে ভর্তি ফি ২০০ ও ট্রলি ফি ২০০ টাকা দাবি করেন কর্মচারী নেতারা। এ ঘটনায় ১৯ সেপ্টেম্বর ওই চিকিৎসক হাসপাতালের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে চুক্তিভিত্তিক তিন কর্মচারীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

তবে চিকিৎসকের মায়ের কাছে টাকা চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অন্যান্য চিকিৎসকের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ২৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন চিকিৎসকরা। তারা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও তাদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। ওই সময়ের মধ্যে ১৬ কর্মচারীকে বদলির আদেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আরও ৭৫ জনকে বদলির প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, ১৬ কর্মচারীকে বদলির আদেশ দেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল চত্বরে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ। বদলির আদেশ পাওয়া কর্মচারী ও তাদের গডফাদাররা গা ঢাকা দিয়েছে। তবে সিন্ডিকেটের মূল হোতারা কর্মচারী ইউনিয়নের নেতা। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলাও রয়েছে। এদের কয়েকজন অনেক আগে থেকে সাসপেনশনেও রয়েছে। সাধারণ কর্মচারীদের অভিযোগ, হাসপাতালে নৈরাজ্যসৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে হাসপাতালের অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বুধবার বিকালে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, ১৬ কর্মচারী এক যোগে বদলির আদেশ হওয়ার পরেও দালালের দৌরাত্ম কমেনি। বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কথিত নেতার ক্যাডাররা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তি বাবদ ২৫ টাকার স্থলে থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছে। তবে কিছুটা বুধবার রাখঢাক করে টাকা নেওয়া হয়েছে। যদিও ট্রলি বাণিজ্য অব্যাহত ছিল।

জরুরি বিভাগে নীলফামারী থেকে আসা অসুস্থ মমতাজ মিয়াকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর পর পরেই ট্রলি বহনকারী কর্মচারী দুজন ব্যক্তি তাকে ট্রলিতে তুলে দেড়শ টাকা দাবি করেন। রোগীর স্বজনরা টাকা দিরেত রাজি না হওয়ায় তারা আধাঘণ্টা ধরে রোগীকে ট্রলিতেই শুইয়ে রাখে। পরে পুলিশের একটি দল ঘটনা স্থলে গেলে ট্রলি ওয়ালারা সটকে পড়ে। পরে স্বজনরাই তাকে বহন করে মেডিসিন ওয়ার্ডে নিয়ে যায়। 

একই অবস্থা দেখা যায় হাসপাতালে ১০ দিন চিকিৎসা নিয়ে একটু সুস্থ হয়ে ট্রলিতে করে চার তলা থেকে নীচে নামানো বৃদ্ধা আকলিমা বেওয়ার স্বজনদের সঙ্গেও। তাদের কাছে দুই নারী ট্রলি বহনকারী ৩০০ টাকা দাবি করে। কিন্তু রোগীর স্বজনরা ১০০ টাকার বেশি দেবেন না জানালে এ নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তর্কবিতর্ক চলার পর শেষ পর্যন্ত দেড়শ টাকা নিয়ে চলে যায়। এ ব্যাপারে ট্রলি বহনকারী আসমা বেগমের কাছে টাকা দাবি করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোগীর লোকজন এমনিতেই বকশিস দেয়, বলতে হয় না। কিন্তু জোর করে আদায় করার কথা জানালে তারা দ্রুত ট্রলি নিয়ে চলে যায়।

এদিকে হাসপাতালের ১০ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, কুড়িগ্রাম থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি থাকা ১০ বছরের শিশু ময়নাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তার মা। তিনি জানান, ডাক্তার তার মেয়ের জন্য কয়েক ধরনের রক্ত পরীক্ষা করতে বলেছে। কিন্তু হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে তিনি দেখতে পান সেটি পুরোপুরি বন্ধ। বরং তাকে বাইরে প্যাথলজি ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করে রিপোর্ট আনতে বলা হয়। এ সময় হাসপাতালের আশ-পাশে থাকা বিভিন্ন প্যাথলজির লোকজন ঘোরাঘুরি করছে। এর মধ্যে সেবা প্যাথলজির এক কর্মী রক্ত পরীক্ষা করে রিপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে রক্ত নিয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন নার্স জানায়, হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে প্যাথলজিকাল পরীক্ষা বন্ধ। এখানে হাসপাতালের বাইরে থাকা পপুলার, আপডেট, ল্যাবএইডসহ বড় বড় ডায়গনস্টিক সেন্টারের কর্মীরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে এসে রক্তের নমুনাসহ অন্যান্য পরীক্ষার জন্য নিয়ে যায়। এ ছাড়াও পুরো হাসপাতালে কে দালাল আর কে কর্মচারী বোঝা মুসকিল। দালালরা রোগীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ক্লিনিকে রোগী নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে সিন্ডিকেট চক্রের হাতে নাজেহাল হতে বলেও জানান তারা।

এভাবেই মেডিসিন, গাইনি, অর্থপেডিক্স, সাজারিসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ‘সুই থেকে শুরু করে সকল চিকিৎসা সামগ্রী বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। ডাক্তাররা প্রেসক্রিপশন করে দিলেও সিন্ডিকেট চক্র সেই বরাদ্দ করা ওষুধ না দিয়ে বাইরে থেকে আনতে বলে। ফলে হাসপাতালে চিকিৎসার নামে চলছে প্রহসন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে হাসপাতালের পরিচালক ডা. শরীফুল হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদফতর ১৬ জনকে এক যোগে বদলির আদেশ দিয়েছেন। তাদের ৭ দিন সময় দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ঠ স্থানে যোগদান করার জন্য। সাত দিন পার হলেই আমরা রিলিজ অর্ডার ধরিয়ে দেবো। বদলির আদেশ বাতিল হওয়ার কোনও সুযোগ নেই।

তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘এক মাস হলো পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছি। এখানে সকল ক্ষেত্রেই অনিয়ম ও দুর্নীতি। চেইন অব কমান্ড নেই। সময় দেন, সব পরিষ্কার করে ফেলবো।’

/ইউএস/
এইচএসসির উত্তরপত্র হারিয়ে ফেলা পরীক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
এইচএসসির উত্তরপত্র হারিয়ে ফেলা পরীক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
এ বছর রোকেয়া পদক পাচ্ছেন যারা
এ বছর রোকেয়া পদক পাচ্ছেন যারা
মির্জা ফখরুলকে ধন্যবাদ দিলেন আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক
মির্জা ফখরুলকে ধন্যবাদ দিলেন আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক
পাঁচ জঙ্গির ৭ দিন করে রিমান্ড
পাঁচ জঙ্গির ৭ দিন করে রিমান্ড
সর্বাধিক পঠিত
রোনালদোর পরিবর্তে দলে জায়গা পেয়ে হ্যাটট্রিক গোঞ্জালো রামোসের
রোনালদোর পরিবর্তে দলে জায়গা পেয়ে হ্যাটট্রিক গোঞ্জালো রামোসের
বল ওনাদের কোর্টে, কী সমঝোতা বলবেন তারাই: মির্জা ফখরুল
নয়া পল্টনে গণসমাবেশের অনুমতি পাচ্ছে বিএনপি?বল ওনাদের কোর্টে, কী সমঝোতা বলবেন তারাই: মির্জা ফখরুল
প্রথম একাদশ থেকে বাদ, বেঞ্চে রোনালদো
প্রথম একাদশ থেকে বাদ, বেঞ্চে রোনালদো
নিষেধাজ্ঞার জাল ভেদ করে কাতার কাঁপানো মিস ক্রোয়েশিয়া!
নিষেধাজ্ঞার জাল ভেদ করে কাতার কাঁপানো মিস ক্রোয়েশিয়া!
সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ১৫ দেশের বিবৃতি
সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে ১৫ দেশের বিবৃতি