‘কতবার বললাম সাবধানে থাকিস, আমাকে এতিম করে দিলো’

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
২০ অক্টোবর ২০২২, ২২:০৭আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২২, ২২:০৭

বাড়ির অবস্থা থমথমে, ভেসে আসছে বিলাপের শব্দ। বাড়িতে প্রবেশের পর দেখা যায়, বারান্দায় কয়েকজন ঘিরে আছেন এক নারীকে। তিনি বিলাপ করেই চলেছেন। বলছেন, ‘বাবা আমি তোকে কতবার বললাম সাবধানে থাকিস। তুই কথা শুনলি না।’ বিলাপ করা নারীটি হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হবিবুর রহমান হলের ছাদ থেকে পড়ে নিহত শিক্ষার্থী গোলাম মুস্তাক শাহরিয়ারের মা।

বৃহস্পতিবার (২০ অক্টোবর) বিকালে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ৬নং ভান্ডারা ইউনিয়নের বেতুড়া গ্রামে শাহরিয়ারের বাড়িতে গিয়ে এ দৃশের দেখা মেলে।

কানতে কানতে শাহরিয়ারের মা শাহানারা বেগম বলেন, ‘মাগরিবের সময় আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। এর আধাঘণ্টা পর আমার ছেলের বউ বলতেছে, শাহরিয়ার দুনিয়া থেকে চলে গেছে। বাবা আমি না তোকে কতবার ভালো করে বুঝাইলাম, তুই একটু ভালো থাকিস। কতবার বলছিলাম, বাবা আমি খারাপ খারাপ স্বপ্ন দেখছি। তুই একটু ভালো করে থাকিস। আমার বাবা আমার কথা শুনলো না, আমাকে এতিম করে দিলো। তুই কেন রেলিংটায় বসছিলি বাবা? রেলিংটাতে বসছে আর পেছন দিকে উল্টে পড়ে গেছে। বাউন্ডারিতে বসছিল, একটা নাকি বিড়াল গেছিল ওর কাছে। বিড়ালটা পড়ে যাচ্ছিল ও বিড়ালটাকে ধরতে গিয়ে পড়ে যায়।’

নিহতের বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘রাত ৮টায় মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। আর ৭টার দিকে মোবাইলে কথা হয়েছে। আমাকে মোবাইলে বলেছে, সে ভাত খাইতে যাবে। আমাকে বলে, বাবা আমি খারাপ স্বপ্ন দেখছি। তোমরা সাবধানে থেকো।’

বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে নিহত শাহরিয়ারের লাশ বাড়িতে পৌঁছেছে। লাশ আসার পরই হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিকাল সাড়ে ৪টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি বাসে করে তার সহপাঠীরা গ্রামের বাড়িতে আসেন। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্টসহ শিক্ষকরাও মাইক্রোবাসে করে এসেছেন। তবে কেউই শাহরিয়ারের মা-বাবার কান্নার লাগাম টানতে পারেননি।

স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার আগেই চাকরি করে বাবার হাতে টাকা তুলে দিতে চেয়েছিলেন শাহরিয়ার। এর আগেই চিরবিদায় নিতে হলো।

শাহরিয়ার দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার ভান্ডারা ইউনিয়নের বেতুড়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য গোলাম মোস্তফা ও শাহানারা বেগম দম্পতির ছোট ছেলে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছিল মেজো। বড় ভাই গোলাম সারওয়ার শাকিল পড়াশোনা শেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করছেন। আর ছোট বোন পড়াশোনা করছে।

মামা আব্দুস সামাদ বলেন, ‘রাত ৯ টার দিকে মৃত্যুর খবর পাই। সে ভালো ছেলে ছিল, লেখাপড়াতেও ভালো। কোনও পার্টির (রাজনীতির) সঙ্গেও জড়িত না। তার চলন, ব্যবহার, আচরণও ভালো। তার সবকিছুই ভালো।’

এলাকার বাবুল হোসেন বলেন, ‘ও আমার পার্শ্ববর্তী চাচাতো ভাই। ওর সঙ্গে কত ঘুমাইছি। বাড়িতে এলে আমার সঙ্গে দেখা করতো, মাঝে মাঝে ফোন দিতো, এসএমএস করতো। খুব সৎ ছিল, শান্ত মেজাজের।’

এলাকার আব্দুল লতিফ বলেন, ‘আমার সামনেই তো জন্মগ্রহণ করেছে। খুব ভালো ছেলে, তাকে ভালো বলেই জানি। কারও সঙ্গে তার কোনও বিরোধ। তার বাবা, মা থেকে শুরু করে তার বংশের সবাই ভালো।’

নিহতের রুমমেট ও সহপাঠী নাজমুল হাসান বলেন, ‘বিগত চার বছর ধরে একরুমে থাকি। আমরা একই ক্লাসে পড়ি, একই ব্যাচের। সে কীভাবে পড়েছে এটা কেউই দেখেনি। সন্ধ্যায় হুট করে কেউ শব্দ পেয়েছে যে ছাদ থেকে কেউ পড়ে গেছে। পরে সেখানে যে গার্ড ছিল তারাই হাসপাতালে ভর্তি করে। সন্ধ্যায় একটি স্বেচ্ছাসেবী কাজ করতে গিয়েছিলাম। রাতে শুনি, পড়ে গেছে, হাসপাতালে আছে। সহপাঠীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আমিও তখন হাসপাতালে ছুটে যাই। হাসপাতালে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট ওখানে কোনও ডাক্তার ছিল না। একজন ইন্টার্ন ডাক্তার ছিল। আমরা আইসিইউতে নেওয়ার জন্য বলি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হবিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘শাহরিয়ার একজন ভালো ছাত্র ছিল। সে ভালো ফুটবল খেলতো। তার ব্যবহারও ভাল ছিল। তার মতো এমন একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে হারিয়ে আমরা শোকাহত।’

উল্লেখ্য, বুধবার সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হবিবুর রহমান হল ভবনের ছাদ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী গোলাম মুস্তাক শাহরিয়ার। পরে সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তিনি মারা যান।

/এফআর/
সম্পর্কিত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই উপ-উপাচার্য নিয়োগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য দফতরে ফুল-উপহার নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ
রাবির ১১ হলে ‘নিষিদ্ধ’ ছাত্রলীগের নতুন কমিটি ঘোষণা, ছাত্রদল বলছে হাস্যকর
সর্বশেষ খবর
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম