আমদানির অনুমতি মেলায় দীর্ঘ ২ মাস ২০ দিন পর দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রয়েছে। এতে করে দেশীয় পেঁয়াজের তুলনায় প্রায় অর্ধেক মূল্যে আমদানিকৃত ভারতীয় পেঁয়াজ পাওয়ায় ক্রেতারাও এসব পেঁয়াজ কিনছেন। তবে স্বাদের কারণে কেউ কেউ বাড়তি দাম দিয়েই দেশীয় পেঁয়াজও কিনছেন। যদিও ক্রেতারা বলছেন, ভারতীয় পেঁয়াজ আসার পর বাজার থেকে দেশীয় পেঁয়াজ একপ্রকার উধাও হয়ে গেছে। আর এ কারণে চাহিদা কমলেও দেশীয় পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা করে বেড়েছে।
বুধবার (১৪ জুন) হিলি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারের অধিকাংশ পেঁয়াজের দোকানেই আমদানিকৃত ভারতীয় পেঁয়াজে সয়লাব হয়ে গেছে। প্রতিটি দোকানেই ভারতীয় ইন্দোর ও নাসিক জাতের পেঁয়াজ শোভা পাচ্ছে। প্রকারভেদে এসব পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে; যা খুচরাতে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে কিছু ছাল ওঠা পেঁয়াজ ৩২ টাকা কেজি দরেও বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বাজার ঘুরে দুটি দোকানে দেশীয় পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় ১০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সেগুলো। গতসপ্তাহে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে হিলি স্থলবন্দরে আমদানিকৃত ইন্দোর ও নাসিক জাতের পেঁয়াজ পাইকারিতে ট্রাক সেল ৩২ টাকা থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
হিলি বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা ইব্রাহিম হোসেন বলেন, গত ঈদের পর থেকেই পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখি হতে শুরু করে। ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ বাড়তে বাড়তে ৯০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছিল। নিত্যপণ্যের এমন বৃদ্ধির কারণে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। এমনকি বাধ্য হয়ে পেঁয়াজ ক্রয়ের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হয়েছিল। যেখানে এক কেজি কিনছিলাম সেখানে হাফ কেজি কিনেও চালাতে হয়েছিল। সম্প্রতি ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরুর ফলে বাজারে পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে আমরা বাজারে ৪০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ ক্রয় করতে পারছি। এতে করে চাহিদামতো যেমন পেঁয়াজ কিনতে পারছি, তেমনি টাকাও কম লাগছে। সামনে যেহেতু কোরবানির ঈদ তাই এসময়ে দাম যেন কম থাকে সেই দাবি জানাচ্ছি।
পেঁয়াজ কিনতে আসা আশরাফুল ইসলাম নামে আরেক ক্রেতা বলেন, বাজারে বর্তমানে দেশীয় পেঁয়াজের এক কেজির দামে প্রায় দুই কেজি আমদানিকৃত ভারতীয় পেঁয়াজ মিলছে। দাম কমের কারণে ও পরিমাণে বেশি মেলায় আমরা ভারতীয় পেঁয়াজই কিনছি। একে তো তেল, চিনি ও ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজিনিসের দাম ঊর্ধ্বমুখি; যার কারণে আমাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় বাড়তি দাম দিয়ে দেশীয় পেঁয়াজ খাওয়ার সাধ্য আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষদের নেই। যার কারণে আমাদের মতো ক্রেতারা আমদানিকৃত ভারতীয় পেঁয়াজই কিনছেন।
ভারতীয় পেঁয়াজের তুলনায় দেশীয় পেঁয়াজের মান বেশ ভালো বলে জানান পেঁয়াজ কিনতে আসা নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘দেশীয় পেঁয়াজ বেশ কিছুদিন রেখে খাওয়া যায়। সেই তুলনায় ভারতীয় পেঁয়াজ বেশি দিন রাখা যায় না। তাছাড়া দেশীয় পেঁয়াজ পরিমাণে কম হলেও কিন্তু ভারতীয় পেঁয়াজ পরিমাণে বেশি লাগে। যার কারণে বাড়তি দাম দিয়ে হলেও দেশীয় পেঁয়াজ কিনছি। তবে গতসপ্তাহে দেশীয় পেঁয়াজের দাম কিছুটা কম ছিল। ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল, এ সপ্তাহে তা বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছে। দামটা যদি আরও একটু কম হলে সুবিধা হতো।
হিলি বাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা শাকিল খান বলেন, ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি বন্ধ থাকায় বেশ কিছুদিন ধরেই দেশীয় পেঁয়াজ দিয়েই ক্রেতাদের চাহিদা মিটছিল। কিন্তু ঈদের পর থেকে সরবরাহ কমতে থাকায় মোকামে দেশীয় পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখি হওয়ায় আমাদের বাড়তি দাম দিয়ে কিনতে হতো, বেশি দামে বিক্রিও করতে হচ্ছিল। এতে করে পেঁয়াজের দাম নিয়ে ক্রেতাদের মাঝে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, আমাদের বেচাকেনা কমে গিয়েছিল। সম্প্রতি আবারও ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরুর ফলে বাজারে আমদানিকৃত পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়ে গেছে। আমরাও স্থানীয় আমদানিকারকদের কাছ থেকে পেঁয়াজ ক্রয় করে এনে বাজারে বিক্রি করছি। এতে করে বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে অর্ধেকে নেমেছে। এছাড়া দাম কমের কারণে ক্রেতারা বেশীরভাগ আমদানিকৃত পেঁয়াজ বেশি কিনছে। যার কারণে চাহিদা তেমন না থাকায় আমরা দেশীয় পেঁয়াজ তুলছি না। তবে দুয়েকটি দোকানে আগের বাড়তি দামের দেশীয় পেঁয়াজ কেনা আছে, সেগুলো তারা বিক্রি করছেন।
হিলি স্থলবন্দর আমদানি রফতানিকারক গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর রেজা বলেন, দেশীয় কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা করে ও তাদের উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমুল্য নিশ্চিত করতে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দেয় সরকার। এতে করে বেশ কিছুদিন ধরে হিলি স্থলবন্দরসহ দেশের সবগুলো স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। দেশের বাজারে একমাত্র দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ থাকায় আড়তদার ও মজুতদারদের কারসাজিতে ধীরে ধীরে এর দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। এমন অবস্থায় পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে আমরা ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতির কথা জানিয়েছিলাম।
দেশীয় পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে সম্প্রতি আবারও পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয় সরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমদানির অনুমতি পাওয়ায় ওই দিন থেকেই বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেছেন আমদানিকারকরা। ইতোমধ্যেই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির ফলে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম নিয়ে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তা নিয়ন্ত্রনে চলে এসেছে পেঁয়াজের দাম অর্ধেকের নিচে নেমেছে। এছাড়া কোরবানির ঈদকে ঘিরে আমরা ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রেখেছি। আরও নতুন করে এলসি খোলা হয়েছে ঈদকে ঘিরে বন্দর দিয়ে পেঁয়াজের আমদানি অব্যাহত থাকবে।’ এতে করে দেশে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন বলেন, পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি না থাকায় গত ১৬ মার্চ থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ছিল। আমদানির অনুমতি মেলায় গত ৫ জুন থেকে আবারও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণ বাড়ছে। আজও বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
বন্দর দিয়ে গত ৫ জুন থেকে গত ১১ জুন পর্যন্ত ১৫৬টি ট্রাকে ৪ হাজার ৬৫টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে বলেও জানান সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, ‘পেঁয়াজ যেহেতু কাঁচামাল গরমে দ্রুত পঁচে যায়। তাই কাস্টমসের প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত যেন এটি বন্দর থেকে আমদানিকারকরা খালাস করে নিতে পারেন বন্দর কর্তৃপক্ষ তার জন্য সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাখেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন্দর দিয়ে পুনরায় পেঁয়াজ আমদানি শুরু হওয়ার ফলে সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বেড়েছে। তেমনি বন্দর কর্তৃপক্ষের দৈনন্দিন আয় বেড়েছে। সেই সঙ্গে কাজ বাড়ায় বন্দরে কর্মরত শ্রমিকদের আয় বেড়েছে।’









