‘গোয়াইল ঘরেত থাকি, এহানেই রাইন্দা এহানেই খাই’

আরিফুল ইসলাম রিগান, বন্যাদুর্গত এলাকা থেকে
১৮ জুলাই ২০২৩, ২৩:৪৫আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৩, ২৩:৫৮

‘আজকা ১৫-২০ দিন বাড়িঘরত পানি। বাড়িতে থাইকতে পারি না। কী খাই, না খাই ঠিক নাই। নৌকাত থাকি, নৌকায় পাকশাক করি। একবেলা রাইন্দা তিনবেলা খাই। বন্যার মধ্যে আমাগো কষ্ট হইছে খুব। ঘাসের অভাবে গরুগুলা নিয়া আরও বিপাকে পড়ছি। কাইশা (কাশগাছ) কাইটা আইনা পানিতে ভিজাইয়া নরম কইরা গরুগুলারে খাইতে দিই। এইভাবে আর কতদিন চলা যায়।’ বন্যায় ভোগান্তির বর্ণনা দিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মুসার চরের বাসিন্দা লাল মিয়া।

ওই চরাঞ্চলের বানভাসিরা বলছেন, ঘরে বাইরে বন্যার পানি থাকলেও তাদের খাবার পানির প্রচণ্ড সংকট দেখা দিয়েছে। টিউবওয়েল তলিয়ে থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করে পান করতে হচ্ছে। শৌচাগার তলিয়ে থাকায় নারীদের বিড়ম্বনা আরও বেশি। শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্রবেষ্টিত শতাধিক পরিবারের সদস্যরা এখনও কষ্টে দিনানিপাত করছেন।

মুসার চরের জয়নুদ্দিনের থাকার ঘরে এখনও কোমর-সমান পানি। কিছুটা ঢালু হওয়ায় তার বাড়ির আঙিনা, রান্নাঘর ,গোয়ালঘর ও শৌচাগার পানিতে নিমজ্জিত। প্রাণ বাঁচাতে জয়নুদ্দিন পরিবার নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সঙ্গে নিয়েছেন গবাদিপশুগুলো।

শোবার ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি, নৌকায় বসবাস

স্বামী-সন্তান নিয়ে গোয়ালঘরে আশ্রয় নিয়েছেন একই গ্রামের কিছুটা দক্ষিণের বাসিন্দা সুকরণ। শোবার ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি হওয়ায় শিশুসন্তান নিয়ে থাকার উপায় নেই। সারাদিন গরু-ছাগলের সঙ্গে দিনযাপন করেন। রাতে শোবার ঘরে উঁচু করা চৌকিতে ঘুমান। খাবার পানি আনতে হয় বানের পানি বেয়ে অন্যের বাড়ি থেকে।

সুকরণ বলেন, ‘দুইডা থাকার ঘরেত পানি, রান্না ঘরেত পানি। একটু উঁচা হওয়ায় দিনে গোয়াইল ঘরেত থাকি। এহানেই রাইন্দা এহানেই খাই। বানের খবর শুইনা ভাই আইছে। তারেও বইসতে দিছি এই গোয়াইলেই। আমাদের কষ্টের কি শ্যাষ আছে।’

বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তার হোসেন বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের পানি স্থির হয়ে আছে। দুই দিন থেকে কমছেও না, বাড়ছেও না। এখনও মুসার চর, বালাডোবার চর, ফকিরের চরসহ কয়েকটি চরের শতাধিক পরিবারের বাড়িঘরে পানি। তারা কষ্টে দিনযাপন করছেন। সরকারিভাবে প্রতিদিন কোনও না কোনও গ্রামে ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত আছে।’

বন্যায় ভোগান্তির বর্ণনা দিয়েছেন বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মুসার চরের বাসিন্দা লাল মিয়া

সোমবার চালের সঙ্গে আলু, তেল, ডাল ও পেঁয়াজসহ ১০০ পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে আক্তার আরও বলেন, ‘আগে চাল দেওয়া হলেও মঙ্গলবার সকালে মুসার চরের ৪৫ পরিবারকে চাল বাদে অন্য উপকরণগুলো দেওয়া হয়েছে।’

তরকারি পাওয়ার কথা স্বীকার করে মুসার চরের মতিয়ার বলেন, ‘সব কয়টা পরিবার সাহায্য পাইছে। উপকার হইছে। কিন্তু পানি নামার লক্ষণ দেহি না। দুই দিন থাইকা ঢিপ খাইয়া (স্থির) আছে। ভোগান্তি আরও বাড়ছে।’

এদিকে, চিলমারীর নয়ারহাট ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আসাদুজ্জামান। তবে ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

চেয়ারম্যান বলেন, ‘ইউনিয়নের বজরা দিয়ারখাতা ও উত্তর খাউরিয়া গ্রামে ভাঙন শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়।’

ব্রহ্মপুত্রের প্লাবিত চরাঞ্চলে এখনও বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলেও দুধকুমার ও ধরলার পানি কমে এই দুই নদ-নদী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি গত দুই দিন ধরে অনেকটা স্থিতিশীল আছে। ফলে বানভাসিদের, বিশেষ করে উলিপুর উপজেলার শতাধিক পরিবারের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি জীবনযাপন করায় নানা সংকটে জীবনযাপন করছেন তারা।

ত্রাণ সহায়তা নিতে বানভাসিদের ভিড়

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, চলমান বন্যায় জেলার ৯ উপজেলায় ৪৫ ইউনিয়নের ১৮৫ গ্রাম কমবেশি প্লাবিত হয়েছিল। প্রায় ১৮ হাজার পরিবারের ৬১ হাজার মানুষ বন্যার কবলে পড়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলায় বন্যা দুর্গত ও ভাঙনকবলিতসহ প্রায় ২৮ হাজার ৫৫০ পরিবারকে সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, মঙ্গলবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত দুধকুমার, ধরলা ও তিস্তার পানি হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে ব্রহ্মপুত্রের পানি অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল। এই সময়ে ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছিল।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, ‘সরকারিভাবে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ অব্যাহত আছে। পানি কমে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে আসা পরিবারগুলো বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। এখন বন্যা পরবর্তী রোগবিস্তার যাতে না হয়, আমরা সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। পাশাপাশি ত্রাণ সহায়তা বিতরণ অব্যাহত থাকবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
খসে পড়ছে পলেস্তারা, তার ভেতরে নাগরিক সেবা
সাত নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে, নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা
বন্যা-জলাবদ্ধতায় ফসলহানি: হাওর রক্ষায় টেকসই পরিকল্পনার আহ্বান
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম