দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হতে চাচ্ছেন রংপুর আওয়ামী লীগের ১৫ নেত্রী। ইতোমধ্যে গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম কিনে জমাও দিয়েছেন তারা। এখন কেন্দ্রীয় লবিং-তদবিরের জন্য ঢাকায় অবস্থান করছেন। ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবন-বৃত্তান্ত দেখিয়ে এমপি হওয়ার প্রত্যাশা তাদের।
জেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা দলের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তদবির করছেন। অনেকে নিজের জীবনবৃত্তান্ত নেতাদের কাছে দিচ্ছেন। এতে দলের পদ-পদবি এবং অতীতের ভূমিকা বিস্তারিত তুলে ধরছেন। তবে এবার প্রত্যাশীদের বিষয়ে জেলার নেতাদের সুপারিশের সুযোগ না থাকায় দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা যাকে নির্বাচন করবেন, তিনিই এমপি হবেন।
জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হতে বিগত দিনে জেলার শীর্ষ নেতা ও এমপিদের সুপারিশ করার সুযোগ ছিল। অনেকে বাবা কিংবা স্বামীর অবদানের কারণে এমপি হতেন। এখন জেলা থেকে সে সুযোগ রাখা হয়নি। কাজের মূল্যায়ন করতে দলীয় সভানেত্রী দায়িত্ব নেওয়ায় এবার মনোনয়নপ্রত্যাশীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ইতোমধ্যে জেলার কোনও কোনও নেত্রী সভানেত্রীর সঙ্গেও দেখা করেছেন।
মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন—আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান রোজি রহমান, বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি মাজেদা বেগম, রংপুর-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এইচএন আশিকুর রহমানের স্ত্রী রেহেনা আশিকুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নাছিমা জামান ববি, কেন্দ্রীয় মহিলা লীগের নির্বাহী সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য পারভীন আক্তার, মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শর্মিলা সরকার রুমা, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সুমনা আক্তার লিলি, জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য লতিফা শওকত, মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলেয়া খাতুন লাভলী, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মরতুজা মনসুর, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিয়া সুলতানা চৈতী, জেলা মহিলা লীগের সহসভাপতি ও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াছ আহমেদের স্ত্রী উম্মে রুহানী কোকিলা, জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী ও সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ফরিদা কালাম, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজুর স্ত্রী ও কারমাইকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বিনতে হুসাইন নাসরিন বানু এবং মহানগর মহিলা লীগের সভাপতি মমতাজ বেগম। তারা প্রত্যেকে দলীয় মনোনয়ন তুলে জমা দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্যে দশম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া ও জাতীয় পার্টির সাহানারা বেগম। তবে একাদশ সংসদে রংপুর থেকে কেউ সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে পারেননি।
এবার সংরক্ষিত আসনে এমপি হওয়ার প্রত্যাশা জানিয়ে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ইলিয়াছ আহমেদের স্ত্রী উম্মে রুহানী কোকিলা বলেন, ‘দলের ত্যাগী কর্মী হিসেবে ৪০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছি। আমরা স্বামী দলের জন্য জীবন দিয়েছেন। দুর্দিনে আমরা দলের সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং থাকবো। আশা করছি, ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবেন সভানেত্রী। এজন্য এমপি হওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’
একই আশাবাদ ব্যক্ত করে জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিয়া সুলতানা চৈতী বলেন, ‘আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দলের দুর্দিনে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাবার পথ ধরে দলের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছি আমি। আশা করছি, বিগত দিনের কাজের মূল্যায়ন করে আমাকে এমপি হিসেবে বিবেচনায় রাখবেন সভানেত্রী।’
২০২২ সালের ডিসেম্বরে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছিলেন হোসনে আরা লুৎফা। এবার সংরক্ষিত আসনে এমপি হওয়ার প্রত্যাশা করছেন। তিনি বলেন, ‘আগেও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলাম। তখন এলাকার অনেক উন্নয়নকাজ করেছি। এবারও এমপি হবো বলে আশা করছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মনোনয়নপ্রত্যাশী কয়েকজন নেত্রী জানিয়েছেন, অনেকে মনোনয়ন চেয়েছেন; তাদের অধিকাংশকে দলের নেতাকর্মীরা চেনেন না। আন্দোলন-সংগ্রামে দেখা যায়নি।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বিষয়ে জেলার নেতাদের সুপারিশের কোনও সুযোগ নেই উল্লেখ করে মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাশেম বলেন, ‘নেত্রী যাকে যোগ্য মনে করবেন, তাকেই এমপি নির্বাচিত করবেন। অনেকে এসে দোয়া চেয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সুপারিশ করতে অনুরোধ করেছেন। আমরা বলেছি, সুপারিশের কোনও সুযোগ নেই। কাজের মূল্যায়ন করবেন সভানেত্রী।’
প্রসঙ্গত, সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। ইতোমধ্যে ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য তাদের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত আসনে সদস্য নির্বাচনের ক্ষমতা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগ তাদের দলের এবং স্বতন্ত্রদের মিলে ৪৮ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য দিতে পারবে। বাকি দুটি আসনে নারী সংসদ সদস্য দিতে পারবে জাতীয় পার্টি (জাপা)। সংরক্ষিত নারী আসনে সদস্য নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত হন। দলগুলো পদের সমপরিমাণ বা একক প্রার্থী মনোনয়ন দিলে ভোটের প্রয়োজন পড়বে। সাধারণত সংরক্ষিত আসনে একক প্রার্থীই মনোনয়ন দিয়ে আসছে রাজনৈতিক দলগুলো। অর্থাৎ নির্বাচিত আসনের সমানুপাতিক যত সংরক্ষিত আসন দলগুলো পাবে, ততজনকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।









