কুড়িগ্রামে নদী ভাঙনে তছনছ ৩০ পরিবার, হুমকিতে অর্ধশতাধিক

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
০৭ অক্টোবর ২০২৫, ০২:১৮আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৫, ০২:১৮

রবিবার (৫ অক্টোবর) দিনগত রাত সাড়ে ১১টা। পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে। সবার অজান্তে দুধকুমার নদ তখন আকস্মিক রুদ্র রূপ ধারণ করেছে। হঠাৎ শুরু হওয়া ভাঙনে ডান তীরের মাটি নদের পানিতে আছড়ে পড়ার শব্দে ঘুম ভাঙে গ্রামবাসীর। ততক্ষণে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রান্নাঘর, টিউবওয়েল, বাড়ির সীমানাপ্রাচীর আবার কারও বা ভিটার অংশ নদের গর্ভে যেতে শুরু করেছে। জীবন বাজি রেখে রাতের অন্ধকারে নারী-পুরুষ সবাই মিলে বসতঘর ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরানোর কাজ শুরু করেন। দিনের আলো ফুটতেই ভাঙনের তীব্রতার সঙ্গে দুর্গতদের কর্মযজ্ঞ বাড়ে। গাছ কেটে নেওয়া, ঘর ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে এগিয়ে আসেন গ্রামবাসী ও স্বজনরা।

রবিবার মধ্যরাত থেকে সোমবার দিনভর কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুধকুমার নদের তীরবর্তী বানিয়াপাড়া গ্রামের চিত্র ছিল এমনই। ভাঙনের তীব্রতায় অন্তত ৩০টি পরিবার বাস্তুহারা, নিঃস্ব। তারা কোথায় যাবেন, পরিবার নিয়ে কীভাবে বসতি গড়বেন, সে চিন্তায় দিশাহারা। এখনও ভাঙন হুমকিতে দাঁড়িয়ে আছে আরও অর্ধশতাধিক পরিবার।

সোমবার বিকালে ভাঙনকবলিত বানিয়াপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তখনও বাড়িঘর ও আসবাবপত্র সরাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ভাঙনকবলিতরা। কেউ ঘর সরাতে ব্যস্ত আবার কেউবা গাছ কেটে সরিয়ে নিচ্ছেন। নারী-পুরুষ কিংবা শিশু কারোরই যেন ফুরসত নেই। দুধকুমারের ক্ষুরধার স্রোতের তোড়ে তখনও তীর ভেঙে আছড়ে পড়ছে পানিতে। যত্নে গড়া বসতির এভাবে বিলীন হওয়ার দৃশ্য হাহাকার নিয়ে দেখছেন বাসিন্দারা। খানিকটা ভাটিতে থাকা বালু ভর্তি শত শত জিও ব্যাগ তাদের হাহাকার যেন বাড়িয়ে দেয়। ‘সঠিক স্থানে’ বস্তুাগুলো ফেললে হয়তো এমন পরিণতি হতো না!

‘কপালে কী আছে আল্লায় জানে! কে জায়গা দেবে আমাক। তিন ছেলে-মেয়ে নিয়া কই যাবো কিছুই জানি না। ঘর দুয়ার ভাঙি নিয়া পশ্চিমের গাছবাড়িত রাখছি। খালি অবহেলায় গ্রামটা ভাঙি গেলো। ভাঙে উত্তরে, বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলায় দক্ষিণে। আমাদেক দেখার কেউ নাই।’ 

এভাবেই নিজেদের দুর্গতি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা বলছিলেন ভাঙনের শিকার বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম।
দুধকুমারের আকস্মিক আগ্রাসী রূপের বর্ণনা করে তাইজুল বলেন, ‘আগেও ভাঙছে। কিন্তু এমন ছিল না। এমনভাবে ভাঙছে মনে হয় সউগ ক্যালে (ছিলিয়ে) নিয়া গেইছে। এক রাইতে অন্তত দুইশ গজের বেশি জায়গা খাইছে।’

‘আমরা তো ভাঙনের জন্য প্রস্তুতি নেই। যেহেতু চরে থাকি সেহেতু ভাঙনের আগেভাগে বুঝতে পারি। একদিনে আর কতদূর ভাঙবে! কিন্তু এমনভাবে ভাঙছে যে সব শ্যাষ করি দিছে,’ যোগ করেন তাইজুল।

তাইজুলের স্ত্রী নাজমা বলেন, ‘রাইত থাকি ভাঙতেছে। সউগ শ্যাষ। এলা ছাওয়া পাওয়া ধরি কোটাই থাকমো।’

শুধু তাইজুল বা তার স্ত্রী নাজমা নন, এমন প্রশ্ন বানিয়াপাড়া গ্রামের ভাঙন কবলিত সব পরিবারে। পরিবার নিয়ে ভবিষ্যৎ বসতি, সন্তানদের লেখাপড়া আর জীবন জীবিকার চিন্তায় দিশাহারা তারা।

গ্রামটির বাসিন্দা গৃহবধূ মনছনা বেগম। অসুস্থ মাকে দেখতে গিয়েছিলেন বাবার বাড়ি। রাতেই খবর পান বাড়ি ভাঙছে। সকাল হতেই বাড়ি ফিরে দেখেন সব শেষ। তার পৌঁছার আগেই বাড়ির সীমানা প্রাচীর, টিউবওয়েলসহ বসতভিটার অনেকটাই নদে বিলীন হয়েছে। দিনভর বাড়িঘর ভেঙে পুরো সংসার তুলে দেন বাবার বাড়ি থেকে আসা নৌকায়। সাথে দুই ছেলেকেও। উদ্দেশ্য চর নারায়নপুর।
বাস্তুহারা মনছনা মুখে কাপড় গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘জায়গা নাই। কোথায় যাবো? সব ভেঙে ভাইয়ের বাড়ি নারায়নপুরে পাঠালাম। এখানে ছিলাম বাচ্চাদের লেখাপড়া করাইছি। ছেলেদের লেখাপড়া সব শেষ হয়া গেলো। ওখানেতো পাড়ালেখা করাইতে পারবো না,’ বলেই কাঁদতে থাকেন।

মনছনা জানান, তার স্বামী ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। দুই মাস ধরে তার কাজ নাই। বেতন বন্ধ। ভবিষ্যৎ কী হবে জানা নেই তার। মনছনার পরিবারের মতো বাড়িঘর ভেঙে সবকিছু নিয়ে এলাকা ছাড়েন হাফিজুর ও তার পরিবার। একটি নৌকায় ভেঙে নেওয়া ঘরের জিনিসপত্রসহ বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানকে তুলে দিয়ে আরেক চরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন হাফিজুর। সেখানে গিয়ে বসতি গড়ে কতবছর স্থায়ী হবেন তা জানা নেই তার। অনিশ্চিত দিনের যাত্রায় ভাঙন কবলিত অন্যসব পরিবারগুলো।

দুধকুমার তীরে দুইশ’ গজ দূরত্বে ভাঙনের হুমকিতে থাকা সত্তোর্ধ্ব মজিবর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সব চোর-চারটার দল। যেখানে বস্তা ফেলা দরকার সেখানে ফেলে না। ঠিক মতো কাজ করলে এমন ক্ষতি হইতো না। ছয় বার বাড়ি ভাঙছে। এবারও থাকবে না।’

সোমবার বিকালে ভাঙন এলাকা পরিদর্শনে যান সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ইসমাইল হোসেন। তিনি ভাঙন কবলিত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করে তাদেরকে মানবিক সহায়তার আশ্বাস দেন। একই সাথে ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসও দেন ইউএনও। তবে ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে তাৎক্ষণিক কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানাতে পারেননি তিনি।

ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাফিলতির প্রশ্নে কিছুটা সাফাই গেয়ে ইউএনও বলেন, ‘তারা (পাউবো) বলেছে ভাটির দিকে ভাঙন ছিল বলে সেখানে বস্তা ফেলা হয়েছে। এছাড়া তাদের লেবার সংকট ছিল। এখন উজানে ভাঙন শুরু হওয়ায় মঙ্গলবার থেকে এখানে বস্তা ফেলা শুরু করবে।’

/এএম/এমএইচআর/
সম্পর্কিত
এক জেলায় নদীভাঙন ঠেকাতে ১৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প
সাতক্ষীরার খোলপেটুয়া নদীর বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন, আতঙ্কে হাজারো মানুষ
নদী ভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপপ্রবাহ নিয়ে কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান 
সর্বশেষ খবর
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৬ জনের মৃত্যু, ৪ জনই গিয়েছিলেন আম কুড়াতে
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধন খসড়া অনুমোদন
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সংশোধন খসড়া অনুমোদন
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী