তিন শতাধিক স্কুল ভবন শিক্ষার্থীদের ‘মরণ ফাঁদ’ 

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম 
১১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০০আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৪৪

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ও তিনতলা ভবনগুলো যেন শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মরণ ফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুল ভবনের গ্রিল ছাড়া বারান্দা এবং ছাদে শিক্ষার্থীদের অবাধ বিচরণ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গত সাত মাসে কুড়িগ্রামে স্কুল ভবন থেকে পড়ে দুই শিশু মারা গেছে। এ অবস্থায় শিশু শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচাতে প্রতিটি স্কুল ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। 

গত ৬ এপ্রিল দুপুরে টিফিন বিরতিতে খেলার সময় চিলমারীর রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কে ডি ওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনের বারান্দার রেলিং টপকে পঞ্চম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থী নিচে পড়ে যায়। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে আহত ওই শিক্ষার্থীকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। 

এর আগে গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর নগেশ্বরী উপজেলার পশ্চিম নাগেশ্বরী বটতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদ থেকে পড়ে একটি শিশুর (৫) মৃত্যু হয়। স্কুলে ঘুরতে আসা ভর্তিচ্ছু ওই শিশু কখন কীভাবে ভবনের ছাদে পৌঁছে, তা কেউ বুঝে ওঠার আগেই নিচে পড়ে যায় বলে দাবি ওই স্কুলের শিক্ষকদের। এসব ঘটনার পর একই নকশার স্কুল ভবনগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে অভিভাবকের মধ্যে বাচ্চাদের স্কুল পাঠাতে অনীহা দেখা দিচ্ছে। 

সাত মাসে কুড়িগ্রামে স্কুল ভবন থেকে পড়ে দুই শিশু মারা গেছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার নয় উপজেলায় একই নকশার ৩০৯টি স্কুল ভবন রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) এসব ভবনের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে। 

তবে এলজিইডির দাবি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ভবনের নকশা অনুমোদন করেছে। এলজিইডি শুধু বাস্তবায়ন করেছে। 

শিক্ষক ও অভিভাবকরা বলছেন, দোতলা ও তিনতলা বিশিষ্ট এসব ভবনের বারান্দায় শর্ট রেলিং থাকলেও গ্রিল নেই। ভবনগুলোর দ্বিতীয় তলায় বরান্দার সঙ্গে একতলার ছাদে যাওয়ার পথ রয়েছে। ফলে শিশু শিক্ষার্থীরা সহজেই রেলিংয়ে উঠে পড়ছে আবার ছাদেও যেতে পারছে। বিশেষ করে স্কুলে পাঠদান শুরুর আগে এবং টিফিন বিরতির সময় শিক্ষার্থীরা খেলায় মেতে ওঠে। এ সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এতে করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়াও এসব ভবনে শিক্ষা উপকরণ নিয়ে নিরাপত্তা সংকট দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগ স্কুল ভবনের চিত্র একই। সরেজমিন জেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। 

চিলমারীর কে ডি ওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনের বারান্দা থেকে পড়ে মারা যাওয়া শিশুটির নাম হাবিবা আক্তার হাসি (১১)। হাসি মুখে স্কুলে যাওয়া শিশুর করুণ মৃত্যু তার বাবা-মা ও সহপাঠীদের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে। তার মৃত্যুর পর স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমেছে। অভিভাবকরা শিশুসন্তানদের স্কুলে পাঠাতে আতঙ্ক বোধ করছেন। 

হাসির মা মরিয়ম বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্কুলের বারান্দায় গ্রিল থাকলে আমার মেয়ের এমন করুণ মরণ হইতো না। একই স্কুলে আমার ছেলে শিশু শ্রেণিতে পড়ে। আমি চাই না আর কোনও মায়ের বুক খালি হোক। ওই স্কুলসহ সব স্কুলে গ্রিল দিয়ে বাচ্চাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।’ 

একই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রেজাউলের মা রঞ্জিনা বেগম বলেন, ‘স্কুলের বাচ্চারা সবাই খেলুক। খেলবার যায়া যদি মারা যায় তাহলে স্কুলে পাঠাই কেমন করি। ওই স্কুল বাচ্চাদের জন্যে নিরাপদ না। আমরা চাই সব স্কুলের বারান্দা গ্রিল দিয়ে ঘেরা হোক।’ একই দাবি অন্য অভিভাবক ও শিক্ষকদের। 

বিদ্যালয়ের ছাদে অবাধে চলাচল করছে শিশুরা কে ডি ওয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলিমুল রাজি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের স্কুল ভবনের বারান্দায় রেলিং থাকলেও গ্রিল নেই। গ্রিল থাকলে এই দুর্ঘটনা ঘটতো না। হাবিবাকেও প্রাণ হারাতে হতো না। ওই নকশায় করা জেলায় আরও অনেক স্কুল ভবনের একই অবস্থা। এগুলোতে গ্রিল দেওয়া জরুরি। নয়তো আরও কোনও হাবিবাকে হয়তো প্রাণ হারাতে হবে।’ 

একই নকশার স্কুল ভবনগুলোকে শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ মনে করছে প্রাথমিক শিক্ষক সমাজ ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ। ভবনগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্রিল স্থাপন করে শিশুদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। 

নাগেশ্বরী উপজেলার কুটি পয়ড়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, টিফিন বিরতির সময় স্কুলের দোতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার রেলিং ধরে শিশুরা খেলছে। অনেকে আবার ছাদের রেলিং ধরে সহপাঠীদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে।  অভ্যন্তরীণ ব্যয়ে ভবনের নিচতলার বারন্দার রেলিংয়ের ওপরের ফাঁকা অংশে গ্রিল দেওয়া হলেও দ্বিতীয় তলার বারান্দায় গ্রিল নেই। ওই বারান্দা দিয়ে একতলার একটির অংশের ছাদে শিশুরা অবাধে যাতায়াত করছে। আবার দ্বিতীয় তলার ছাদের দরজা খোলা থাকায় সেখানেও শিশুরা অবাধে যাতায়াত করতে পারছে। 

স্কুলটির প্রধান শিক্ষক শাহানাজ পারভীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে নকশায় ভবনগুলো তৈরি করা হয়েছে তা শিশুদের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। কেন যে এভাবে ভবনগুলো অনিরাপদ করে তৈরি করা হয়েছে তা আমরা জানি না। এগুলোতে পরিপূর্ণভাবে গ্রিল দিয়ে নিরাপদ করা দরকার।’ 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবনগুলোর নকশা শিশুদের জন্য নিরাপদ নয় বরং ক্রটিপূর্ণ। আমরা বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে এগুলো বলে আসছি। বারান্দায় রেলিংয়ে ফাঁকা থাকায় এবং পুরো বারান্দায় গ্রিল না থাকায় শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নিজেদের ব্যয়ে কিছু ভবনের বারান্দায় আমরা গ্রিল দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি।’ 

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ইউনুস হোসেন বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবনগুলোর নকশা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর অনুমোদন করেছে। এলজিইডি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। স্থানীয়ভাবে নকশা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এটা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারাধীন।’ 

/এএম/
সম্পর্কিত
প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জাতীয় পর্যায়ের খেলা উদ্বোধন বৃহস্পতিবার
‘স্কুল ফিডিংয়ে অনিয়ম গাফিলতি বরদাশত করা হবে না’
শনিবার প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা না বন্ধ? 
সর্বশেষ খবর
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
ইরানি ইসলামি শাসনবিরোধী শিল্পী মারজান সাত্রাপির প্রয়াণ
ইরানি ইসলামি শাসনবিরোধী শিল্পী মারজান সাত্রাপির প্রয়াণ
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী