রংপুরের হাঁড়িভাঙা আমের খ্যাতি যেমন, চাহিদাও তেমন তুঙ্গে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হয়। একসময় মিঠাপুকুর উপজেলায় চাষ হলেও এখন জেলার প্রায় সব উপজেলায় হয়। এই আম চাষে অনেকের ভাগ্য বদলে গেছে। হয়েছেন স্বাবলম্বী। তবে এবার প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা। এ বছর ২০০ কোটি টাকার হাঁড়িভাঙা আম বিক্রির আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
আগামী ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাঁড়িভাঙা বাজারজাতের সময় নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। তবে কিছু কিছু উপজেলায় অতি গরমে পেকে যাওয়ায় ১৫ জুন থেকেও আম পাড়া যাবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিঠাপুকুর উপজেলা।
২৫ কোটি টাকার আগাম অর্ডার
বাগান মালিক ও চাষি জানিয়েছেন, অন্যান্য বছরের মতো এবার আগেভাগেই ঢাকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি স্থানে ২৫ কোটি টাকার আম পাঠানোর অর্ডার পেয়েছেন। আম পরিপক্ব হতে হতে ৫০ কোটি টাকার অর্ডার পাওয়ার আশা করছেন বাগান মালিক ও চাষিরা। গত বছরও আগাম অর্ডার ছিল ৫০ কোটির।
রংপুরে হাঁড়িভাঙা আমের সবচেয়ে বড় বাগানের মালিক রমজান আলী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকা থেকে বেশ কয়েকজন আড়তদার ও ব্যবসায়ী এবারও আমের জন্য অগ্রিম অর্ডার করছেন। আমার মতো আরও ৪০টি বাগান মালিকের সঙ্গে তাদের অগ্রিম চুক্তি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০ কোটি টাকার আগাম অর্ডার মিলেছে। আম পাড়ার সময় আসতে আসতে এটি ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
একই কথা বলেছেন আম চাষি রবিউল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত বছরের মতো এবারও আম পাঠানোর আগাম অর্ডার পেয়েছি। আম পাড়া শুরু হতে হতে এই অর্ডারের পরিমাণ আরও বাড়বে।’
৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রংপুরে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২০০ হেক্টর বেশি। তা থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন হওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ। সবমিলিয়ে ২০০ কোটি টাকার বেশি আম বিক্রি হবে।
কৃষি বিভাগ বলছে, হাঁড়িভাঙা আম পুরোপুরি পুষ্ট হতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আমের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগে। পুরোপুরি পুষ্ট হওয়ার জন্যই আগামী ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য বারের চেয়ে এবার আমের আকারও বড় এবং ফলনও বেশ ভালো হয়েছে।
এমনটি জানিয়েছেন রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবার অবিরাম ঝড়বৃষ্টির কারণে আমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে এটি স্বাভাবিক ঘটনা। এতে উৎপাদনে তেমন প্রভাব পড়বে। চাষের জমি বাড়ায় ফলনও প্রত্যাশা অনুযায়ী হবে। আমের আকারও এবার বেশ বড়। সবমিলিয়ে ২০০ কোটি টাকার বেশি আম বিক্রি হবে বলা যায়।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দা সিফাত জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা এবারও রফতানি হবে। আবহাওয়া প্রতিকূলতার কারণে এবার ফলন একটু কম হলেও তা ধরার মতো নয়। ৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।’
ফলন কমের শঙ্কায় চাষিরা
চাষিরা বলছেন, এবার আমের জন্য আবহাওয়া তেমন অনুকূলে ছিল না। বিশেষ করে শুরুতে বৃষ্টি না হওয়া এবং প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, আবার মুকুল ও গুঁটি আসার পর বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য উৎপাদন কিছুটা কম হতে পারে। আবার এ বছর বাজারে আমের দামও কম। ন্যায্যমূল্য পেলে তারা লাভবান হবেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রফতানি বেশি হলে বেশি লাভবান হবেন বলেও জানান তারা।
হাঁড়িভাঙার ইতিহাস
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ৩৫ বছর আগে থেকে রংপুরের মিঠাপুকুরে বাণিজ্যিকভাবে হাঁড়িভাঙা চাষ হচ্ছে। হাঁড়িভাঙা আমের গোড়াপত্তন করেছিলেন নফল উদ্দিন। শুরুতে নাম ছিল মালদিয়া। এরপর বদরগঞ্জ উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকায় প্রথমে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন আব্দুস সালাম। তার সফলতা দেখে এলাকার মানুষ চাষ শুরু করে। এই এলাকার মাটি লাল ও কাদাযুক্ত হওয়ায় বছরে একবার ধান ছাড়া কোনও ফসল হতো না। সে কারণে এলাকার সবাই হাঁড়িভাঙা চাষ শুরু করেন। পরে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র।
এরপর গোপালপুর, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ ও সদর উপজেলার লাল মাটিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়। বিশেষ করে বদরগঞ্জের গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর, পদাগঞ্জের কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট, সর্দারপাড়া, সদর উপজেলার সদ্যপুস্করনী ইউনিয়নের কাঁটাবাড়ি, মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ, রানীপুকুর ও বলদিপুকুর এলাকার প্রায় সব গ্রামে হাঁড়িভাঙার বাগান আছে। ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এসব বাগান। এর মধ্যে বিশেষ করে বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার ৯০টি গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা খুলে দিয়েছে এই আম চাষ। এসব গ্রামের হাজার হাজার পরিবার আম বিক্রি করে এখন স্বাবলম্বী।
হাঁড়িভাঙার জন্য প্রসিদ্ধ এলাকা পদাগঞ্জ। এই নামে গ্রামে একটি হাট আছে। পদাগঞ্জ এলাকার চাষিরা সাধারণত বাগান বিক্রি করেন না। গাছ থেকে আম পেড়ে পদাগঞ্জ হাটে বিক্রি করেন। এই আম চাষে এখন স্বাবলম্বী তারা। গত কয়েক বছরে গ্রামের দৃশ্য বদলে গেছে। আম চাষে পুরো বছর সংসার চলে তাদের।
কেন ফলন কমের শঙ্কা
পদাগঞ্জের কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট ও সর্দারপাড়ার একাধিক চাষি জানিয়েছেন, এ বছর পুরো বৈশাখ মাসজুড়ে অবিরাম ঝড়বৃষ্টির কারণে আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এজন্য ফলন কমের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর সব আম একসঙ্গে বাজারে আসায় সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। না হয় আরও বেশি লাভবান হতেন। আবার বড় বড় ব্যবসায়ীরা আগাম টাকা দিয়ে বাগান কিনে নেওয়ায় চাষিরা ন্যায্যমূল্য পান না। লাভবান হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না।
কোন মাটিতে হাঁড়িভাঙার উৎপাদন ভালো হয়
চাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত লালমাটি ও কাদাযুক্ত এলাকায় হাঁড়িভাঙার উৎপাদন ভালো হয়। এবার বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় ফলন কম হয়েছে। সেইসঙ্গে গত বছরগুলোতে দাম ভালো পাওয়ায় নতুন নতুন বাগান গড়ে তুলেছেন চাষিরা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা যোগাযোগ শুরু করেছেন, কেউ কেউ আগাম অর্ডার দিয়েছেন। তবে কৃষি অধিদফতরের দেওয়া তারিখ অনুযায়ী গাছ থেকে আম পাড়বেন চাষিরা।
আম বেচে স্বাবলম্বী
সরেজমিন পদাগঞ্জ ও খোড়াগাছ এলাকার কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখা গেছে, শত একরজুড়ে আম বাগান। প্রতিটি বাড়িতে ১০-১৫টি গাছ আছে। প্রতিটি গাছে ঝুলছে আম।
পদাগঞ্জ এলাকার আম চাষি মনোয়ার হোসেন, রহমত আলী ও খোড়াগাছ এলাকার আয়েশা বেগম জানান, ১০ বছর আগেও তাদের এলাকা ছিল দারিদ্র্যপীড়িত। মানুষ তিন বেলা তো দূরের কথা একবেলাও খাবারের জোগান দিতেও হিমশিম খেতো। এলাকার মাটি লাল হওয়ায় এখানে বছরে একবার ধান উৎপাদন হতো। বাকি আট মাস জমি পড়ে থাকতো। পরে হাঁড়িভাঙা ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছে। এখন ধানের বদলে সবাই আমের বাগান করেছেন। তাদের প্রত্যেকের পাঁচ থেকে ১০ একর জমিতে বাগান আছে। আম বিক্রি করে তাদের পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে। এক মৌসুমে আম বিক্রির টাকায় পুরো বছর চলে যাচ্ছে তাদের।
মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘যাদের জমি নেই, সেসব ভূমিহীন পরিবারগুলো বসতভিটার আশপাশে আম গাছ লাগিয়ে সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করছেন। তবে আমাদের দাবি একটাই, আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কম দামে বিক্রি করতে হয়। এজন্য সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই।’
বাজারজাত করতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা বাজারজাত করতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সে জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরাসরি বাগান থেকে যাতে আম কিনতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকার ও ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। টাকা লেনদেনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ খোলা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হবে।’
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে আম পাঠানোর জন্য পদাগঞ্জ এলাকায় অফিস স্থাপন করছে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো। তারা বাগান থেকে আম সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা করেছে। আমরা ২০ জুন থেকে হাঁড়িভাঙা বাজারজাত করার সময় নির্ধারণ করে দিয়েছি। কৃষি বিভাগ ও চাষিদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সময় নির্ধারণ করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে আম পাড়া শুরু হবে।’
১৫ জুন থেকেও পাড়া যাবে আম
মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম বলেন, ‘এবার ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাঁড়িভাঙা বাজারজাতের সময় নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। তবে কিছু কিছু উপজেলায় অতি গরমে পেকে যাচ্ছে বলে চাষিরা আমাদের জানিয়েছেন। এজন্য ১৫ জুন থেকেও আম পাড়া যাবে বলে জানিয়ে দিয়েছি আমরা। যেসব স্থানে আম পাকবে ১৫ জুন থেকে পাড়া যাবে।’
তিনি বলেন, ‘মিঠাপুকুরে প্রতি বছর হাঁড়িভাঙা আমের চাষ বাড়ছে। লাভ বেশি হওয়ায় লোকজন ধানি জমিতে আমের বাগান করছেন। ১ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে ৪ হাজার ৭৫টি হাঁড়িভাঙা আমের বাগান আছে। গত বছর ৯০ থেকে ১০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হয়েছে। এ বছর ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার বেশি হাঁড়িভাঙা বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সব মাটিতে এ আমের চাষ করা যায়। তবে এঁটেল ও দো-আঁশ মাটি এই আম চাষের জন্য বেশি উপযোগী। এক একর জমিতে বছরে সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকা পাওয়া যায়। মাঝারি প্রতিটি গাছে সার ও কীটনাশক বাবদ বছরে খরচ হয় ৫০০-৬০০ টাকা। পাঁচ বছর বয়সী প্রতিটি গাছের আম বিক্রি করে গড়ে চার হাজার টাকা পাওয়া যায়।’









