রংপুরের ‘হাঁড়িভাঙা’ জাতের আমের সুখ্যাতি এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি এ বছর আম পরিপক্ব হওয়ার আগেই মালয়েশিয়া, নেপাল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানির জন্য অন্তত ২৫ কোটি টাকার আমের অর্ডার পেয়েছেন বাগান মালিকরা। একসময় বদরগঞ্জ উপজেলায় চাষ হলেও এখন জেলার প্রায় সব উপজেলায় হয়। এই আম চাষে অনেকের ভাগ্য বদলে গেছে। এ বছর ২০০ কোটি টাকার হাঁড়িভাঙা আম বিক্রির আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
হাঁড়িভাঙার বৈশিষ্ট্য
এই জাতের আমের বৈশিষ্ট্য হলো আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু। ছাল খুব পাতলা এবং আঁটি ছোট। প্রতিটির ওজন ১৫০-৩০০ গ্রাম হয়। প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর ভেতরে কোনও আঁশ থাকে না। শাঁসটি মাখনের মতো নরম ও মিষ্টি হয়। আঁটি অত্যন্ত ছোট হয় এবং খোসা খুবই পাতলা থাকে। ফলে আমের খাওয়ার যোগ্য অংশ বা শাঁস বেশি পাওয়া যায়। এটি খেতে অত্যন্ত মিষ্টি এবং এর রয়েছে চমৎকার সুগন্ধ, যা আমপ্রেমীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। এই আমে কোনও রকম কৃত্রিম রাসায়নিক বা কার্বাইড ব্যবহার করে পাকানো হয় না, এটি প্রাকৃতিকভাবেই গাছে বা ঘরে পেকে থাকে। উত্তরবঙ্গের রংপুর, বিশেষ করে মিঠাপুকুর অঞ্চলের মাটির গুণে এই আমের স্বাদ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনন্য হয়। ইতিমধ্যে এটি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এসব কারণে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
কবে বাজারে আসবে
সাধারণত জুনের তৃতীয় সপ্তাহে এই আম বাজারে আসে। তখন থেকেই সারা দেশ ও বিদেশে পাঠানো হয়। এ বছর আগামী ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাঁড়িভাঙা বাজারজাতের সময় নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। তবে কিছু কিছু উপজেলায় অতি গরমে পেকে যাওয়ায় ১৫ জুন থেকেও আম পাড়া যাবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিঠাপুকুর উপজেলা।
৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রংপুরে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২০০ হেক্টর বেশি। তা থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন হওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ। সবমিলিয়ে ২০০ কোটি টাকার বেশি আম বিক্রি হবে।
কৃষি বিভাগ বলছে, হাঁড়িভাঙা আম পুরোপুরি পুষ্ট হতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আমের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগে। পুরোপুরি পুষ্ট হওয়ার জন্যই আগামী ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যান্য বারের চেয়ে এবার আমের আকারও বড় এবং ফলনও বেশ ভালো হয়েছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দা সিফাত জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী ২০ জুন থেকে হাঁড়িভাঙা পাড়া শুরু হবে। ওই দিন থেকে বাজারে পাওয়া যাবে। এবারও বিদেশে রফতানি হবে। আবহাওয়া প্রতিকূলতার কারণে এবার ফলন একটু কম হলেও তা ধরার মতো নয়। ৩০ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। সবমিলিয়ে ২০০ কোটি টাকার বেশি আম বিক্রি হবে বলা যায়।’
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা বাজারজাত করতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সে জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরাসরি বাগান থেকে যাতে আম কিনতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকার ও ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। টাকা লেনদেনের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ খোলা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হবে। আমরা ২০ জুন থেকে হাঁড়িভাঙা বাজারজাত করার সময় নির্ধারণ করে দিয়েছি। কৃষি বিভাগ ও চাষিদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই সময় নির্ধারণ করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে আম পাড়া শুরু হবে।’
১৫ জুন থেকেও আম পাড়া যাবে
মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম বলেন, ‘এবার ২০ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাঁড়িভাঙা বাজারজাতের সময় নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। তবে কিছু কিছু উপজেলায় অতি গরমে পেকে যাচ্ছে বলে চাষিরা আমাদের জানিয়েছেন। এজন্য ১৫ জুন থেকেও আম পাড়া যাবে বলে জানিয়ে দিয়েছি আমরা। যেসব স্থানে আম পাকবে ১৫ জুন থেকে পাড়া যাবে।’









