দুর্নাম ঘুচিয়ে আলোর পথে কুড়িগ্রাম

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
২১ আগস্ট ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৬, ১০:০১

একসময়ে সর্বাধিক বাল্যবিয়ের জেলার ‘দুর্নাম’ ঘুঁচিয়ে উঠতে শুরু করেছে কুড়িগ্রাম। চরাঞ্চল অধ্যুষিত জেলাটিতে বাল্যবিয়ের কুফল নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড আর প্রশাসনিক নজরদারির কারণে অনেক পরিবার এই অভিশাপের পথে হাঁটা বন্ধ করেছে। 

কিশোরীদের সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেক বাবা-মা শত কষ্টেও বাল্যবিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। তবে লক্ষ্য অর্জনে আরও তৎপরতা জরুরি বলে মনে করছেন অংশীজনরা।

কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং বিয়ে রেজিস্ট্রেশন শতভাগ অনলাইন করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করে চর ও গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে বাল্যবিয়ের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন অংশীজনরা।

বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট

জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে জানা গেছে, বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের পরিবারগুলোর অনেকের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে আগ্রহী। ভরণপোষণের জন্য অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজছেন। অনেকে আয়বৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে নিচ্ছেন।

উলিপুরের দুর্গাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আমিনা বেগম-মোজাম্মেল হক দম্পতি। ভ্যানচালক মোজাম্মেলের পরিবারে তিন মেয়ে। বাল্যবিয়েতে এই দম্পতির সাফ কথা-‘না’। মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে বাড়তি আয়ের জন্য বাড়িতেই মুদি দোকান চালু করেন আমিনা। প্রসারিত হয় সম্ভাবনার দুয়ার। আয় বাড়ে, মেয়েদের পড়ালেখার খরচের জোগান হয়। ১৮ পূর্ণ করে দুই মেয়ের বিয়ে দেন। ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।

আমিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাল্যবিয়ে ভালো না। মেজো মেয়েকে মাসখানিক আগে বিয়ে দিয়েছি। জামাই শিক্ষিত, চাকরিজীবী। মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেবে। পড়াশোনা না করালে তো এমন জামাই পেতাম না। ছোট মেয়েকেও পড়াবো, যতদিন সে পড়তে চায়।’

গ্রামের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে জানিয়ে আমিনা বলেন, ‘গ্রামে বাল্যবিয়ে আগের চেয়ে কমে গেছে। কোনও বাবা-মা বাল্যবিয়ে দিতে চাইলে মেয়েরা নিজেই বাধা দেয়। তাছাড়া বাবা-মায়েরা আগের চেয়ে সচেতন হইছে। খবর পাইলে আমরাও বাধা দিই।’  

রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী গ্রামের মোহাম্মদ আলী-চায়না বেগম দম্পতি। সম্বল বলতে পাটখড়ি নির্মিত একটি মাত্র ঘর। সেই ঘরে তিন মেয়ে নিয়ে বসবাস। মোহাম্মদ আলী পেশায় দিনমজুর।

এই দম্পতির বড় মেয়ে স্নাতক আর মেজো মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে এখনও কোলের শিশু। শত অভাবেও মেয়েদের বাল্যবিয়ে দেননি। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ছেন। বাড়তি আয়ের জন্য চায়না বেগম নিয়মিত তাঁতের শাড়ি বুনছেন। টানাপোড়নের সংসারে টিকে থাকতে বাড়ির আঙিনায় পেঁপেসহ সবজি আর বস্তায় আদা চাষ করেছেন।

চায়না বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সংসারের কাজের সঙ্গে তাঁতের কাজ করে যে আয় করতাছি, তাতে দুই মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাইতে পারছি। ওরা যদ্দিন ইচ্ছা পড়বো, তারপর বিয়াশাদি।’

চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাল্যবিয়ে কমেছে, তবে এখনও হচ্ছে। বেশিরভাগ গোপনে। সচেতনতা বাড়ানোর সঙ্গে শতভাগ অনলাইন রেজিস্ট্রেশন চালু করলে এটা বন্ধ করা সম্ভব।’ গোপন বাল্যবিয়ে প্রকাশ হওয়ার পরও আইনের আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।

পরিসংখ্যান যা বলছে

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের ২০১৪ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ছিল প্রায় ৬৫ ভাগ। কুড়িগ্রামের ক্ষেত্রে এই চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ অর্থাৎ ৭৮ ভাগ, যা সর্বোচ্চ। ‘এন্ডিং চাইল্ড ম্যারেজ: প্রগ্রেস অ্যান্ড প্রসপেক্টস’ শীর্ষক ইউনিসেফের ওই প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের বাল্যবিয়ের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

বিগত কয়েক বছরে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক কার্যক্রম চলে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জেলার পরিবারগুলো মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হচ্ছে। দিন দিন বাল্যবিয়ের হার কমছে। যদিও কমার এই হার স্বস্তিদায়ক নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাল্টিপল ক্লাস্টার সার্ভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে কুড়িগ্রামে বাল্যবিয়ের হার ছিল ৬২ দশমিক ৫ ভাগ। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৩ সালের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স (মার্চ, ২০২৪ সালে প্রকাশিত)-এর তথ্য বলছে, কুড়িগ্রামে ১৮ বছরের নিচে বিয়ের হার ৫৪ দশমিক ৮ ভাগ। অর্থাৎ নয় বছরে বাল্যবিয়ের হার কমেছে ২৩ ভাগেরও বেশি।

এরপর আরও আড়াই বছর সময় কেটে গেছে। নতুন কোনও পরিসংখ্যান না থাকলেও অংশীজনরা বলছেন, জেলায় বাল্যবিয়ে কমেছে। কিছু উদ্যোগ নিলে তা ন্যূনতম মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

লক্ষ্য অর্জনে করণীয়

কুড়িগ্রাম সদরের চরাঞ্চলের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মামুন-উর-রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাল্যবিয়ে কমছে, তবে হার কম। কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করলে বাল্যবিয়ে আরও কমে আসবে। স্কুল-কলেজ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নারীদের স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার প্রসার ঘটবে এবং উপার্জনের পথ তৈরি হবে। এতে করে পরিবারগুলো তাদের মেয়েদের বাল্যবিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, কাজিসহ অংশীজনদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’

প্রশাসনের উদ্যোগ কী

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাল্যবিয়ে আগের তুলনায় বিশেষ করে করোনার সময়ের তুলনায় কমেছে। তবে বন্ধ হয়নি। প্রশাসন এটা নিয়ে কাজ করছে।’

প্রশাসনের উদ্যোগ নিয়ে ডিসি বলেন, ‘যেসব এলাকায় সংকট রয়েছে সেসব এলাকায় স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। মানুষকে সচেতন করতে স্থানীয় প্রশাসন সভা-সমাবেশ আয়োজন করছে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন করা হচ্ছে। নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হচ্ছে। বাল্যবিয়ে দিলে সরকারি বিভিন্ন ভাতা বাতিল করা হবে।’
 
শতভাগ জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হলে বাল্যবিয়ে দ্রুত উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে প্রত্যাশা করে ডিসি বলেন, ‘কুড়িগ্রাম জন্মনিবন্ধনে অনেক পিছিয়ে। এটা এগিয়ে নিতে ইউএনওদেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইপিআই কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারলে বাল্যবিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
বাল্যবিয়ে- প্রথম পর্বএই গ্রামে প্রাথমিক পার হলেই মেয়েদের বিয়ে হয়, বেশি গেলেই ‘কদর’ শেষ
বাল্যবিবাহ: আইনে কী আছে শাস্তির ব্যবস্থা
বিয়ে নিবন্ধনে ‘কাগজের’ জন্মসনদ চলবে না, আর কী পরিবর্তন আসছে
সর্বশেষ খবর
রাষ্ট্রপতির শপথ: যেসব সড়ক এড়িয়ে চলবেন আজ 
রাষ্ট্রপতির শপথ: যেসব সড়ক এড়িয়ে চলবেন আজ 
হোয়াটসঅ্যাপ আরও নিরাপদ রাখতে যে ৫টি সেটিংস চালু করবেন
হোয়াটসঅ্যাপ আরও নিরাপদ রাখতে যে ৫টি সেটিংস চালু করবেন
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ে আনন্দের বন্যা
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ে আনন্দের বন্যা
ভাইভার আগের ১ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ, কী করবেন এ সময়?
ভাইভার আগের ১ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ, কী করবেন এ সময়?
সর্বাধিক পঠিত
অবশেষে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে অচলাবস্থার অবসান
অবশেষে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে অচলাবস্থার অবসান
বিএনপির বাইরেও  ১১ ভোট বেশি পেয়েছেন মির্জা ফখরুল
বিএনপির বাইরেও ১১ ভোট বেশি পেয়েছেন মির্জা ফখরুল
যে ৩ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি রুমিন ফারহানা
যে ৩ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি রুমিন ফারহানা
পাল্টা পদক্ষেপে পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিলো ভারত
পাল্টা পদক্ষেপে পাকিস্তান হাইকমিশনের বাইরের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিলো ভারত
‘আপনিই আমার সব’: ট্রাম্পকে লেখা ব্যক্তিগত সহকারীর আবেগী চিঠিতে প্রেমের বিতর্ক
‘আপনিই আমার সব’: ট্রাম্পকে লেখা ব্যক্তিগত সহকারীর আবেগী চিঠিতে প্রেমের বিতর্ক