কাঁদলেন পুলিশ কমিশনার, বললেন ‘তার বয়সী আমারও এক ছেলে আছে’

লয়াকত আলী বাদল, রংপুর
২৩ আগস্ট ২০২৬, ২১:০২আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ২১:০২

রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের বাকি তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনার বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল, সে ব্যাপারে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ব্রিফিং করার সময় গলা জড়িয়ে আসে তার। একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।

রবিবার (২৩ আগস্ট) বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে ব্রিফিং করেন। তিনি জানান, নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় এক পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তারা। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়। 

আটক দুই যুবক হলো সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩)। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। রবিবার ভোরে নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। তাদের বাড়ি নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আশপাশে। পুলিশ জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করে। আর সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি জুয়েলারি দোকানে প্রায় আট বছর ধরে কারিগর হিসেবে কাজ করছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় লুট করে নিয়ে যাওয়া বেশ কিছু সোনার অলংকার।

সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন পুলিশ কমিশনার 

পুলিশ কমিশনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত দল ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু বা আলামত সংগ্রহ করে, যা অপরাধীদের শনাক্ত করতে সরাসরি সাহায্য করেছে। বিশেষ করে বাড়ির ছাদে ইয়াবা বা মাদক সেবনের স্পষ্ট আলামত পায় পুলিশ। এ ছাড়া খুনিরা ঘরে থাকা ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছিল এবং সেখানে খেজুরের বিচিও ফেলে যায়। খেজুরের বিচি ও কামড়ানো অর্ধেক শসা ফেলে যায় তারা। আবার ঘর তল্লাশির সময় আগুন দিয়ে টেস্ট করা বা পোড়ানো স্বর্ণের চুড়ি পাওয়া যায়। এটি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় ঘটনার সঙ্গে স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ স্থানীয় কেউ জড়িত আছে।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির তৃতীয় তলার ছাদে ওঠে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী তৃতীয় তলার খোলা ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবনে বাধা দেয়। এ সময় ওই দুই তরুণ গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে। এ সময় গণপতি চক্রবর্তীর চিৎকার শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০) তৃতীয় তলার ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরে বাসায় ঢুকে ঘুমিয়ে থাকা ১৩ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

এক পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ

নিহতদের সঙ্গে আটক দুই যুবকের আগে থেকেই পরিচয় ছিল উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ একে একে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করে। হত্যার পর রাতে ওই বাড়িতেই অবস্থান করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। বাসায় তারা গোসল করে, ফ্রিজ থেকে খেজুর ও শসা বের করে খায় এবং ইয়াবা সেবন করে। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার আগে আলমারি ও ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেয়। লুট করে স্বর্ণালংকার নিয়ে ঘটনাস্থলের অদূরে একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘরের টেবিলের ওপর ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। পাশাপাশি একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার দায় স্বীকার করেছে। নিহত পরিবারের লুট হওয়া স্বর্ণালংকার ওই দুই যুবকের দেখানো একটি পরিত্যক্ত জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়। নিহত শিক্ষকের বাসায় থাকা দুটি মোবাইল ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিল তারা। আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে। ঘরের ভেতর থেকে খেজুরের বিচি জব্দ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।’

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কেঁদে ফেলেন পুলিশ কমিশনার। বলেন, ‌‘নিহত আয়ুশ চক্রবর্তীর বয়সী আমার একটা ছেলে আছে। খুনিরা তাকেও ছাড়েনি। আটক হওয়ার পর চার জনকে খুনের কথা স্বীকার করেছে তারা। লুট করে নিয়ে যাওয়া স্বর্ণালংকার তাদের দেখানো জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সেইসঙ্গে এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী, রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তীসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার আটক দুই ব্যক্তির সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে দেননি। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবে কিনা, কখন তাদের আদালতে তোলা হবে এমন প্রশ্নের জবাব দেননি পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। এ ছাড়া সাংবাদিকদের প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান তিনি।

যেভাবে ৪ লাশ উদ্ধার

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুদিন ধরে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের। শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান শ্যালিকা। সেখানে গিয়ে দেখেন বাড়ি তালাবদ্ধ। জানালা দিয়ে দেখেন এলোমেলো ঘর। বেশ কিছু দিন ধরে বাড়িটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়ির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর ওই বাড়ির দোতলা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রবিবার ভোরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। 

আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ

স্থানীয়রা জানায়, নিহত গণপতি চক্রবর্তী শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর নিজ বাসায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। পরিবার নিয়ে বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। ভবনটির প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ আছে।

হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইলেন গণপতি চক্রবর্তীর সহকর্মীরা

রবিবার সকালে রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক ঘটনাস্থলে যান। প্রধান শিক্ষক জানান, গণপতি চক্রবর্তী জিলা স্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এলপিআরে গেছেন। তার ও পরিবারের সবার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। 

যা বললেন স্থানীয় এমপি ও জনপ্রতিনিধিরা

সকাল সাড়ে ৯টায় রংপুর-৩ আসনে জামায়াতের এমপি মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল, মহানগর জামায়াতের আমির এটিএম আযম খান দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ওই শিক্ষকের বাসায় যান। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এমপি বলেন, ‌‘এক পরিবারের চার জনকে হত্যার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো রংপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার করতে হবে।

দুপুরে রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারাই জড়িত থাকুক না কেন, গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
অগোছালো থাকাটাই নাকি ট্রেন্ড! সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে ‘কাইন্ডা চিক’
অগোছালো থাকাটাই নাকি ট্রেন্ড! সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হচ্ছে ‘কাইন্ডা চিক’
হাসপাতালে মজুত থাকলেও রোগীকে স্যালাইন না দেওয়ায় টাকা ফেরত দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
হাসপাতালে মজুত থাকলেও রোগীকে স্যালাইন না দেওয়ায় টাকা ফেরত দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
পররাষ্ট্রে দুই প্রতিমন্ত্রীর কার কী কাজ, জানালো মন্ত্রণালয়
পররাষ্ট্রে দুই প্রতিমন্ত্রীর কার কী কাজ, জানালো মন্ত্রণালয়
নিবন্ধন পেতে ইসিতে ফের আবেদন বাংলাদেশ জনতা পার্টির
নিবন্ধন পেতে ইসিতে ফের আবেদন বাংলাদেশ জনতা পার্টির
সর্বাধিক পঠিত
নতুন দায়িত্বে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন 
নতুন দায়িত্বে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন 
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তারা, প্রতিবাদ জানাতে এসে অজ্ঞান ব্যবসায়ী
১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ব্যাংক কর্মকর্তারা, প্রতিবাদ জানাতে এসে অজ্ঞান ব্যবসায়ী
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
রংপুরে শিক্ষক পরিবারের ৪ জনকে হত্যার রহস্য উদঘাটন, যা জানালো পুলিশ
ব্রাজিল খেলবে বাংলাদেশে? আজ আসছে প্রতিনিধি দল
ব্রাজিল খেলবে বাংলাদেশে? আজ আসছে প্রতিনিধি দল