রংপুর জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার এক আসামি এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তার পরনে একই ধরনের শার্ট দেখা যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান সনাতন চক্রবর্তী গত শনিবার রাত ১১টার দিকে মাছুয়াপাড়া এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং রবিবার ভোর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। রবিবার বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানান হত্যার ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়েছে। তারা হলেন সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩)। এর মধ্যে রবিবার দুপুরে সিদ্ধার্থ দাসকে আদালতে নেওয়ার সময় তার পরনে এমন একটি শার্ট ছিল, যা ঘটনাস্থলে থাকা ডিবি প্রধান সনাতন চক্রবর্তীর পরা শার্টটির মতোই মনে হচ্ছিল। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মুখে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সনাতন চক্রবর্তী।
স্থানীয় বাসিন্দা শিবু দাস বলেন, ‘আমি সিদ্ধার্থকে অনেক দিন ধরে চিনি। আদালতে নেওয়ার সময় সে যে শার্টটি পরেছিল, তা তাকে আগে কখনও পরতে দেখিনি। হয়তো পুলিশই তাকে এটি দিয়েছে।’
সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ দাস জানান, গতকাল ভোরে পুলিশ যখন তার ভাইকে আটক করে, তখন সে একটি কালো গেঞ্জি পরেছিল; এমন কোনও শার্ট তার ভাইয়ের কখনোই ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই কীভাবে ওই শার্টটি পরলো, তা আমি জানি না। এ বিষয়ে পুলিশই ভালো বলতে পারবে।’
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস—যিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন—তিনিও বলেছেন, তিনি এক পুলিশ কর্মকর্তাকে একই ধরনের শার্ট পরা অবস্থায় দেখেছিলেন। তার ছেলের পরনে সেদিন গেঞ্জি ছিল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান সনাতন চক্রবর্তী সোমবার সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসামির পরনে যে শার্ট ছিল, সেটি দেখতে আমার শার্টের মতোই রং। আমার শার্টটি এখনও আমার গায়ে আছে, আর আসামির শার্টটি তার গায়েই আছে। আমার শার্টটি আড়ং থেকে কিনেছিলাম। অনেকের কাছেই একই ডিজাইনের শার্ট থাকতে পারে। তবে তার শার্টের সঙ্গে আমার শার্টের কোনও সম্পর্ক নেই। বিষয়টি নিয়ে একটি মহল ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে।’
এর আগে বিকালে একই বিষয়ে সনাতন চক্রবর্তীকে তার কার্যালয়ে প্রশ্ন করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। তখন তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আসলে আপনারা যে শার্টটা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন, ওই দিন আমি এই শার্টটা পরেছিলাম—এখন দেখেন, আমি এখনও ওই শার্টটাই পরে আছি। আর যেটি আসামির পরনে ছিল, সেটি তো তার সঙ্গেই আছে। আপনাদের ওই সময়ে তোলা ছবি, আমি যে সময় ফিল্ডে ছিলাম, তার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তোলা একটা ছবি দেখালাম। সেখানেও দেখা গেলো একই। পরে আসামির পরনেও একই ধরনের রঙের একটি শার্ট পরা ছিল। দুইটা দুজনের শার্ট। আসলে মামলার তদন্তকে বিভ্রান্ত করে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে কতিপয় কুচক্রী মহল বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এটার সঙ্গে এই চার খুন বা চার খুনের তদন্ত, বা এই যে আটক ব্যক্তিদের জবানবন্দি—এগুলোর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই। এটা আমি আবারও বলছি, যে পুলিশকে একটু বিভ্রান্ত করার জন্য বা দেশবাসীকে একটু বিভ্রান্ত করার জন্য এই স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন ধরনের চাল চালছে। এই যে শার্টটা পরে আছি, এটা আড়ংয়ের শার্ট। আড়ং এই একই ব্র্যান্ডের হাজার হাজার শার্ট তৈরি করে বিক্রি করেছে। বিশ্বাস না হলে আড়ংয়ের কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন।’
গত শনিবার রাতে ওই বাড়ির দোতলা থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গণপতি চক্রবর্তী পরিবার নিয়ে বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন। ভবনটির প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ আছে।
এ ঘটনায় রবিবার বেলা দেড়টার দিকে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, এক পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তারা। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়।
আটক দুই যুবক হলো সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তারা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। রবিবার ভোরে নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। তাদের বাড়ি নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আশপাশে। পুলিশ জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করে। আর সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি জুয়েলারি দোকানে প্রায় আট বছর ধরে কারিগর হিসেবে কাজ করছে। চার জনকে হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও সিআইডি যৌথভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই রহস্য উদ্ঘাটন করে।
রবিবার রাতে রংপুর মহানগর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রফিকুল ইসলামের আদালতে তারা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় বলে জানায় পুলিশ। এর আগে রাত ৮টায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের আদালতে তোলা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) নির্মল চন্দ্র এ তথ্য জানিয়েছেন।

খেজুর-শসার সূত্র ধরে চার খুনে জড়িতদের যেভাবে ধরলো পুলিশ
রংপুরে চার খুন: স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলো দুই আসামি 







