রংপুরে চার খুন

পুলিশের তদন্ত নিয়ে ১৯ প্রশ্ন নাগরিক কমিটির, আসামিদের পক্ষে লড়বেন না কোনও আইনজীবী

রংপুর প্রতিনিধি
২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০৭ আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০৭

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত ও বক্তব্য নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা বিবেচনায় গ্রেফতার আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি।

শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে রংপুর নগরের জাহাজ কোম্পানি এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে নাগরিক কমিটি। এ সময় লিখিত বক্তব্যে পুলিশের তদন্ত নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তুলে ধরেন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনা রংপুরসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুকতা স্পষ্ট হয়েছে। এ ঘটনায় দুই আসামিকে গ্রেফতারের পর পুলিশ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন, সংশয় ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় নাগরিক কমিটি মনে করছে, পুলিশের বয়ানের সঙ্গে নিহতদের স্বজনদের বক্তব্য, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং পুলিশ ও ফরেনসিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে সাংঘর্ষিক তথ্য রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে একটি পরিবারের চার জনকে হত্যা করার ঘটনা কতটা স্বাভাবিক, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। চার জনকে হত্যার পর আসামিরা দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে গোসল ও খাবার খেয়েছে, পুলিশের এই বর্ণনাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ও গণপতি চক্রবর্তীর বাসার বিদ্যুৎ-সংযোগের তার কে বা কারা কেটেছে, হত্যার আগে ও পরে অচেনা মোটরসাইকেলে আনাগোনা কারা করেছিল এবং কেউ বাড়িটি পর্যবেক্ষণ করছিল কিনা, এসব বিষয় যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়েছে কিনা, তা জানতে চেয়েছে নাগরিক কমিটি।

১৯টি প্রশ্ন তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি

পাশাপাশি লুট হওয়া টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, পুলিশের বক্তব্যে লুট হওয়া টাকার পরিমাণ এবং আসামিদের ভাগে পাওয়া অর্থের হিসাবে অসংগতি রয়েছে। একইভাবে ইয়াবার সংখ্যার হিসাব কেন পরিবর্তিত হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের আগে নিহত পরিবারের সদস্যদের কোনও আশঙ্কা বা অভিযোগ ছিল কিনা, বাড়ি নির্মাণ নিয়ে তাদের কাউকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল কিনা এবং এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা হয়েছে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর চায় নাগরিক কমিটি। সব মিলিয়ে সংবাদ সম্মলনে ওই চার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ১৯টি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে নাগরিক কমিটি।

নাগরিক কমিটির নেতা পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘শুধু আসামিদের স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করে তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত, মোবাইলের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যসহ সব তথ্যের সঙ্গে পুলিশের বর্ণনা মিলিয়ে দেখতে হবে। পুলিশের বক্তব্যের অসংগতিগুলো দূর করে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে হবে।’

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, শুধু এই হত্যাকাণ্ড নয়, দেশে সংঘটিত প্রতিটি হত্যার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সঠিক তদন্ত প্রয়োজন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চায়।

সংবাদ সম্মেলন থেকে গণপতি চক্রবর্তীসহ চার হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত, প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নাগরিক কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার, বিজয় প্রসাদ তপু, বীথি দাস নন্দিনী, মাহফুজ হোসেন, মসিউর রহমান, সবুজ রায় ও মেহেদী হাসান প্রমুখ।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, চার জনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় এ ঘটনা ঘটে।

গ্রেফতার আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি

এ ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে মামলায় একই এলাকার কানু দাসের ছেলে মুগ্ধ দাস ও বিনয় দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার দুজন আদালতে স্বেচ্ছায় হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

এদিকে এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার আসামিদের পক্ষে আপাতত আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রংপুর আইনজীবী সমিতি। একই সঙ্গে এ ঘটনায় ভবিষ্যতে কেউ গ্রেফতার হলেও তার পক্ষে আইনজীবী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তের গতিপথ বা ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পরিবর্তিত হলে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে সমিতি।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব ও সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী।

আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘চার জনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তাদের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি বোঝা যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত আমরা আপাতত নিয়েছি। অনেকেই মনে করেন, আইনজীবীরা টাকার বিনিময়ে অন্যায়কে সমর্থন করেন। এটি মোটেই ঠিক নয়। চার খুনের ঘটনায় আসামিদের পক্ষে আদালতে না দাঁড়ানোই তার বড় প্রমাণ।’

 

/এএম/ 
সম্পর্কিত
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
তাহসিফকে সেই বারে রেখে ২০ মিনিট কোথায় ছিলেন দীপ 
৬০ লাখ নেওয়ার পর আরও ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, যুবদল নেতা গ্রেফতার
সর্বশেষ খবর
জাতীয় পরিবেশ পদকের জন্য আবেদন আহ্বান
জাতীয় পরিবেশ পদকের জন্য আবেদন আহ্বান
দুঃখ প্রকাশের চিরকুটসহ জাপানি দোকানে ফিরলো ৩ কোটি টাকার ঘড়ি
দুঃখ প্রকাশের চিরকুটসহ জাপানি দোকানে ফিরলো ৩ কোটি টাকার ঘড়ি
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
ধানক্ষেতে দুজনকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় সেখানেই স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা
ইউরোপজুড়ে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে হ্যাকাররা
ইউরোপজুড়ে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে হ্যাকাররা
সর্বাধিক পঠিত
‘আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
চাঁদাবাজির মামলায় চার্জশিট দাখিল ‘আমি গরিবের ছেলে, লোভ সামলাতে পারিনি’, জবানবন্দিতে ‘সমন্বয়ক’ রিয়াদ
যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা চালালে কী করতে হবে, জনগণকে জানিয়ে দিলো ইরান
যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা চালালে কী করতে হবে, জনগণকে জানিয়ে দিলো ইরান
কোটার বাইরেও যাওয়া যাবে ইতালি, বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সুযোগ
কোটার বাইরেও যাওয়া যাবে ইতালি, বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সুযোগ
এবার আরেক মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কয়েক হাজার শ্রমিক
এবার আরেক মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কয়েক হাজার শ্রমিক
শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে মাকে হত্যা করা সেই সন্তান কারাগারে মারা গেছেন
শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে মাকে হত্যা করা সেই সন্তান কারাগারে মারা গেছেন