রংপুর সিটি করপোরেশনে আইটি কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. আফরাফ হোসেন সোহেলের মাসিক বেতন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুন্নবী ডন। তবে তার নিয়োগ প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। গত জানুয়ারি মাসে ছয় জনের জন্য তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলেও এরই মধ্যে আট মাস কেটে গেছে। কিন্তু যে কাজের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল, তার কিছুই হয়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
অপরদিকে, করপোরেশনের সাবেক কর্মকর্তা একেএম আহসান ফরিদ রুম্মন চাকরিতে না থেকেও বিভিন্ন শাখায় প্রভাব বিস্তার করছেন এবং সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার নামে দাফতরিক কাজে হস্তক্ষেপ করছেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর করপোরেশনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক আশরাফুল ইসলাম তার দায়িত্বকালে মো. আফরাফ হোসেন সোহেলকে আইটি কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। এ নিয়োগের জন্য কোনও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি এবং গোপনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের পর তার মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
সিটি করপোরেশনের অন্তত তিন কর্মকর্তা জানান, নগরবাসীর বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের কর নির্ধারণসংক্রান্ত সফটওয়্যার আপডেট ও সচল করার দায়িত্ব দেওয়া হয় সোহেলকে। কিন্তু আট মাস পার হলেও সেই কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। অর্থাৎ কোনও কাজ করেননি। ফলে কর নির্ধারণ ও বিল প্রিন্টের কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারের কর বিল এখনও অনেক করদাতার কাছে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এর পেছনে সফটওয়্যার-সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। অথচ আইটি কনসালট্যান্ট সোহেলকে প্রতি মাসে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, সোহেলের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কর নির্ধারণ, বিল প্রিন্ট ও কর আদায়ের কার্যক্রম পুরোপুরি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকেও স্পষ্ট কোনও সময়সীমা পাওয়া যাচ্ছে না।
চাকরিতে নেই, তবু দাফতরিক কাজে প্রভাবের অভিযোগ
এদিকে রংপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক কর্মকর্তা একেএম আহসান ফরিদ রুম্মনের বিরুদ্ধেও দাফতরিক কাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, সাবেক মেয়র শরফ উদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর সময় রুম্মন করপোরেশনে প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় বিভিন্ন অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইসিটি বিভাগে কর্মরত রুম্মন করপোরেশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহযোগিতায় সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করেন এবং বিভিন্ন শাখায় প্রভাব বিস্তার করেন। যদিও তিনি বর্তমানে করপোরেশনের কোনও কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী নন।
কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, কর ও বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহারের কথা বলে রুম্মন করপোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছেন। এমনকি তার আচরণে নিজেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন শাখার স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিনি হুমকি দেন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর কমিয়ে দেওয়ার জন্য ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর এবং করপোরেশনের আইটি শাখার বিভিন্ন মালামাল কেনাকাটায় নিজের পরিচিত বা স্বজনের প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া নিজ উদ্যোগে সভা ডেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তার নির্দেশনা অনুযায়ী চলার কথা বলা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মচারী।
ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় আলোচনা
সম্প্রতি আইটি কনসালট্যান্ট আফরাফ হোসেন সোহেল এবং সাবেক কর্মকর্তা একেএম আহসান ফরিদ রুম্মনের করপোরেশনের দফতরে অবস্থান ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ছবি ও ভিডিও নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নগরবাসীর মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আফরাফ হোসেন সোহেল ও একেএম আহসান ফরিদ রুম্মনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে
রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুন্নবী ডন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইটি কনসালট্যান্ট আফরাফ হোসেন সোহেলের নিয়োগ আগের প্রশাসকের সময়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার মাসিক বেতন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি। সাবেক কর্মকর্তা ফরিদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগসহ সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, বিশাল অঙ্কের রাজস্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর নির্ধারণ ও আদায় কার্যক্রম সচল রাখা এবং করপোরেশনের দাফতরিক কাজে কে কীভাবে যুক্ত হচ্ছেন, সে বিষয়ে প্রশাসনের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।









