সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নামে ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে অর্জিত ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ার দাবি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে আনিসুল হক ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৩টি ব্যাংক হিসাবে জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকার অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
তদন্ত শেষে আনিসুল হকের পাশাপাশি তার কথিত কাজিন মোহাম্মদ ইকবাল, ভাগ্নে শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম এবং ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হক কলিকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
দুদকের উপ-পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ গত বছরের ১ জানুয়ারি আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছিল। মামলার নম্বর-১। মামলাটি তদন্ত করেন দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম।
মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় দায়ের করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রে দণ্ডবিধির ১০৯ ধারাও যুক্ত করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে সম্পদের পরিমাণ বেড়ে ১৮০ কোটি
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছিল, ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আনিসুল হক ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসাধু উপায়ে নিজ নামে এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ১৪৬ কোটি ১৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৬ টাকার সম্পদ অর্জন ও দখলে রেখেছেন।
এজাহারের ওই অভিযোগের ভিত্তিতে এর আগে আদালত আনিসুল হকের বিভিন্ন সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশও দিয়েছিলেন। দুদকের আবেদনে তখন তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে তদন্তে সম্পদের পরিমাণ আরও বেড়েছে বলে দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত আনিসুল হক নিজ নামে ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৬৮ হাজার ২২৫ টাকার স্থাবর এবং ৯১ কোটি ৯২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫৫ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। সব মিলিয়ে তার নিজ নামে পাওয়া সম্পদের পরিমাণ ৯৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকা। এর বাইরে আরও তিন ব্যক্তির নামে আনিসুল হকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার ১ টাকার সম্পদ পাওয়ার দাবি করেছে দুদক।
তিনজনের নামে ৮৪ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, আনিসুল হকের ছোট ভাই প্রয়াত আরিফুল হকের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হক কলির নামে ২৩ কোটি ৩২ লাখ ২ হাজার ৩২১ টাকার অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। তার ভাগ্নে শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলামের নামে পাওয়া গেছে ২০ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার ৪৪৪ টাকার অস্থাবর সম্পদ।
আর ‘কাজিন’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ ইকবালের নামে ৪০ কোটি ১ লাখ ২৩ হাজার ২৩৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে দুদক। এই তিনজনের নামে পাওয়া সম্পদের পরিমাণ মোট ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার ১ টাকা।
দুদকের অভিযোগ, তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আনিসুল হককে এসব সম্পদ অর্জনে সহায়তা করেছেন। এ কারণে মামলার এজাহারে তাদের নাম না থাকলেও তদন্ত শেষে তাদের আসামি করা হয়েছে।
সিটিজেনস ব্যাংকের নিজস্ব ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও মোহাম্মদ ইকবালকে ১০ শতাংশ, শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলামকে ৫ শতাংশ এবং জেবুন্নেসা বেগম হককে ২ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক হিসেবে দেখানো হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে আনিসুল হককেও ১০ শতাংশ শেয়ারের স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বৈধ সঞ্চয় ৮ কোটি, সম্পদ প্রায় ১৮১ কোটি
দুদকের তদন্তে আনিসুল হকের বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১৩ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। একই সময়ে তার পারিবারিক ব্যয় হিসেবে ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৯৮ টাকা। ব্যয় বাদ দেওয়ার পর তার গ্রহণযোগ্য নিট আয় বা সঞ্চয় দাঁড়ায় ৮ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ৯৪০ টাকা।
অপরদিকে, নিজের ও অন্যদের নামে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের অর্জনকালীন মূল্য পাওয়া গেছে ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ টাকা। দুদকের হিসাবে, গ্রহণযোগ্য নিট আয় বাদ দিলে ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার সম্পদের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। এই অর্থকেই আনিসুল হকের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ হিসেবে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আনিসুল হক এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ২৩টি ব্যাংক হিসাবের লেনদেনও পর্যালোচনা করেছে দুদক। এসব হিসাবে মোট ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫২ টাকা জমা হয়েছে। উত্তোলন করা হয়েছে ৩৬১ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার ১২৯ টাকা। জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে মোট লেনদেন হয়েছে ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকা।
এসব লেনদেনকে ‘অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে দুদক। সংস্থাটির অভিযোগ, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বা সম্পদের অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করতে অর্থ রূপান্তর, স্থানান্তর ও হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে স্বার্থসংশ্লিষ্ট তিন ব্যক্তির সম্পদের একটি বড় অংশ হিসেবে সিটিজেনস ব্যাংকের শেয়ারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের তথ্যমতে, জেবুন্নেসা বেগম হকের ২৩ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ১০ কোটি টাকার সিটিজেনস ব্যাংকের শেয়ার এবং প্রায় ১৩ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলামের ২০ কোটি ৭১ লাখ টাকার বেশি সম্পদের মধ্যে ২০ কোটি টাকার বেশি সিটিজেনস ব্যাংকের শেয়ার এবং মোহাম্মদ ইকবালের ৪০ কোটি ১ লাখ টাকার বেশি সম্পদের প্রায় পুরোটাই সিটিজেনস ব্যাংকের শেয়ার বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
যে ধারায় অভিযোগপত্র
তদন্ত শেষে দুদক বলছে, আনিসুল হক জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থপাচারসংক্রান্ত অপরাধ করেছেন এবং অন্য তিন আসামি এসব সম্পদ অর্জনে তাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন।
এ কারণে আনিসুল হক, মোহাম্মদ ইকবাল, শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম ও জেবুন্নেসা বেগম হক কলির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
অভিযোগপত্র আদালতে দাখিলের পর অভিযোগগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।









