লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায় বীরাঙ্গনা ফুলমতির, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

গাইবান্ধা প্রতিনিধি 
০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধাহত নারী মুক্তিযোদ্ধা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দিয়ে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকাল ৩টার দিকে সাদুল্লাপুরের উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করেন। 

এ সময় সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হাসান কবীরসহ প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিজ বাড়ির উঠানে পূর্বসূরিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে মারা যান ফুলমতি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেন স্ট্রোকে তার ডান হাত-পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী ছিলেন। মৃত্যুকালে চার ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন এই বীরাঙ্গনা।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার আগে আশরাফুল হক বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছেন বা অবদান রেখেছেন, তারা এ দেশের সূর্যসন্তান। তাদের আত্মত্যাগ অবিস্মরণীয়।’ যুদ্ধাহত ফুলমতিকে পরবর্তীতে বীরাঙ্গনার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম সম্পাদিত হৃদয়ে একাত্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফুলমতি রানি নামে পরিচিত এই বীরাঙ্গনার জন্ম সাদুল্লাপুরের জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা তাকে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতন চালায়। স্বামীর বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে তার সামনেই ফুলমতির ওপর নির্যাতন চালানোর ঘটনাও বইটিতে উল্লেখ রয়েছে।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর ২০১৬ সালের মার্চে বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান ফুলমতি। ২০১৭ সালে তার জন্য নির্মাণ করা হয় চার কক্ষের ‘বীর নিবাস’। স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া ১৯৮৮ সালে মারা যাওয়ার পর পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সংগ্রামী জীবন কাটান তিনি। অভাব-অনটনের মধ্যেও শেষ দিন পর্যন্ত কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি এই আত্মমর্যাদাশীল নারী।

সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান। শয্যাশায়ী অবস্থায় তার চিকিৎসায় সরকারি পর্যায় থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে ফুলমতি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি; শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী।’ 

ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার রবিদাস জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার মা নানা রোগে ভুগছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেন স্ট্রোকের পর তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর নিজ ঘরেই তার মৃত্যু হয়। মাকে বাড়ির উঠানে সমাহিত করা হয়েছে। তিনি মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।

ফুলমতির মৃত্যুতে মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, ফুলমতি শুধু একজন নারী নন— তিনি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার নির্যাতন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান তারা। 

উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোছা. মাহাবুবা বেগম বলেন, ‘বীরাঙ্গনা ফুলমতির আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে; তার স্মৃতি ধরে রাখতে সমাধিস্থলে স্মৃতিফলক নির্মাণ জরুরি।’ 

লাল-সবুজের পতাকায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় নিয়েছেন বীরাঙ্গনা ফুলমতি। তার নির্যাতন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বেদনাবিধুর অথচ গৌরবময় অধ্যায় হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
৪৫ বছর পর স্বীকৃতি, বীরাঙ্গনা ফুলমতির শেষ বিদায় লাল-সবুজের পতাকায়
খেতাবপ্রাপ্ত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন ভাতা নির্ধারণ
‘আপনারা ৭১ সালে কোথায় ছিলেন’
সর্বশেষ খবর
ছাগলে করলা গাছ খাওয়াকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে নিহত ১, আহত ৪
ছাগলে করলা গাছ খাওয়াকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে নিহত ১, আহত ৪
ধানম‌ন্ডি‌তে ‌শিক্ষার্থী-স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা, হোস্টেল ভাঙচুর
ধানম‌ন্ডি‌তে ‌শিক্ষার্থী-স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা, হোস্টেল ভাঙচুর
ওলিসের গোল ও উপমেকানোর লাল কার্ড, ইতালির সঙ্গে ড্র করলো ফ্রান্স
ওলিসের গোল ও উপমেকানোর লাল কার্ড, ইতালির সঙ্গে ড্র করলো ফ্রান্স
অবশেষে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি এলো ঢাকায়
অবশেষে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি এলো ঢাকায়
সর্বাধিক পঠিত
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
নির্বাচনের আগেরদিন গ্রেফতার, তবুও বিপুল ভোটে জিতলেন আ.লীগ নেতা
ব্র্যাকের পর নতুন যাত্রায় মিথিলা
ব্র্যাকের পর নতুন যাত্রায় মিথিলা
পাঁচ বছরে ৩২ দফায় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম
পাঁচ বছরে ৩২ দফায় বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে এলপিজির দাম
ফের বাড়লো তেলের দাম
ফের বাড়লো তেলের দাম
ভারতের পর পাকিস্তানি নায়িকা শাকিবের!
ভারতের পর পাকিস্তানি নায়িকা শাকিবের!