বিশ্ব দরবারে শীতল পাটির স্বীকৃতি নতুন হলেও এর জয়জয়কার এই প্রথম নয়। আপন মহিমায় এ পাটি মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজ প্রাসাদে স্থান করে নিয়েছিল। মৌলভীবাজারের বড়লেখার দাসের বাজারের শীতল পাটি সম্রাট আওরঙ্গজেবকে উপহার দিয়েছিলেন মুর্শিদ কুলি খাঁ। এখনও এ পাটির বিশেষ কদর রয়েছে। বাড়িতে অতিথি আসলে তাদের বসার জন্য বিছিয়ে দেওয়া হয় শীতল পাটি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষ করে মেয়ের বিয়েতে শীতল পাটি উপঢৌকন হিসেবে দেওয়ার চল রয়েছে। অনেক সময় শীতল পাটি গৃহকর্তার সম্মান বৃদ্ধিরও প্রতীক হয়ে ওঠে। সুন্দর নকশার একটি শীতল পাটি ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি রুচিরও পরিচয় দেয়। এ পাটি অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও অনেকে এ পাটি বানিয়ে উপার্জন করেন।
৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো শীতল পাটির বুনন পদ্ধতিকে ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় যুক্ত করেছে। বিশ্বসভায়ও শীতল পাটি বিশেষ স্থান পাওয়ায় উৎফুল্ল স্থানীয়রা।
সাধারণত কৃষক পরিবারের গৃহিণীরাই শীতল পাটি তৈরি করেন। শুধু সংসার চালানোর জন্যই নয়, ঐতিহ্য ধরে রাখতেও অনেকে এ পাটি বুনে থাকেন। এক সময় স্বচ্ছল পরিবারের গৃহিণীরাও অবসরে পছন্দসই নকশায় বুনতেন শীতল পাটি।
সিলেট অঞ্চলে শীতল পাটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গরমকালে এর চাহিদা বহুগুণে বেড়ে যায়। দেশ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে থাকা বাঙালিদের কাছেও এর ব্যাপক সমাদর রয়েছে। এসব দেশে সিলেট থেকে শীতল পাটি রফতানি করা হয়।
শীতল পাটি মূলত সিলেটের বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ, জকিগঞ্জ, ওসমানীনগর, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, গোয়াইন ঘাটের সালুটিকর, কোম্পানীগঞ্জ, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের প্রায় পাঁচ শতাধিক গ্রামে বুনন করা হয়। এসব উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ব্যবসায়ীরা পাটি সংগ্রহ করে তা সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করার পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি করে থাকেন। নকশা ও পাটির আকার অনুযায়ী দাম ভিন্ন। বিদেশে যেসব পাটি যায় সেগুলোর নকশা হয় তুলনামূলক বেশি আকর্ষণীয়।
সিলেট অঞ্চলে কারুকাজভেদে শীতল পাটির রয়েছে বিভিন্ন নাম। এর মধ্যে পয়সা, সিকি, শাপলা, সোনামুড়ি, টিক্কা, লালগালিচা, আধুলি, মিহি উল্লেখযোগ্য। ৮০০ থেকে শুরু করে ৬ হাজার টাকার পাটিও রয়েছে। শীতল পাটির মূল উপাদান মুর্তা শুষ্ক মৌসুমে রোপণ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে এই বেত পরিপক্ক হলে পানিতে ভিজিয়ে পাটি তৈরির উপযোগী করা হয়। এরপর চলে পাটি বুনন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের তুলানায় এখন শীতল পাটির ব্যবসা অনেকটাই কম। চাহিদা মতো পাটি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি শীতল পাটি বুনতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। তবে এটা বানিয়ে খুব বেশি মজুরি পান না কারিগররা।
সিলেটের গোলাপগঞ্জের বাঘা গ্রামের গৃহিণী নাসিমা বেগম বলেন, ‘বিয়ের ১৫ বছর হয়েছে। বাপের বাড়িতে মা-চাচিদের দেখেছি পাটি বানিয়ে বিক্রি করে কিছু টাকা আয় করতেন। আমার স্বামী একজন কৃষক, তার একার আয় দিয়ে সংসার চলে না। তাই আমিও পাটি বানিয়ে বিক্রি করি।’
তিনি জানান, তার বানানো ছোট একটি পাটি ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আর বড় পাটি; যেগুলোতে নকশা আছে, সেগুলো দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
২৭ বছর ধরে বালাগঞ্জে পাটি বিক্রি করে আসছেন বিলবাড়ি গ্রামের নিখিল দাস। তিনি জানান, খুব একটা উপার্জন না হওয়ায় অনেক কারিগর শীতল পাটি বোনা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ সিংহ বলেন, ‘বালাগঞ্জের শীতল পাটির অনেক নাম-ডাক রয়েছে। আমাদের জন্য সত্যিই গৌরবের বিষয় যে বাঙালির ঐতিহ্য শীতল পাটিকে বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে।’
সিলেট নগরীর পূর্ব কাজিরবাজারের পাটি বিক্রেতা জহির মিয়া জানান, ১৯ বছর ধরে তিনি পাটি বিক্রি করছেন। কিন্তু আগের তুলনায় এখন পাটি বিক্রি কম। তবে গরমকালে পাটি বিক্রি হয় বেশি।







