‘এই ড্যাম হওনে আমরা দুডা কইরা ফসল করতা পারবাম। আগে মাটির বান দিয়া পানি আটকাইয়া ক্ষেত লাগানি লাগতো, এখন এ সমস্যার শেষ হইতাছে’- এভাবেই চিলা নদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণে সুফলের কথা বলছিলেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার চিলাই পাড় গ্রামের হাফিজ আলী। এই নদীতে রাবার ড্যাম নির্মাণ হলে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের দুই হাজার কৃষকের চার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আসবে। ফলে কৃষকের ভাগ্য বদলে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সুনামগঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলার মেঘালয় পাহাড় ঘেঁষা সীমান্তবর্তী চিলাই নদীতে বিএডিসির তত্ত্বাবধানে ৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ৬৫ মিটার দীর্ঘ ও সাড়ে চার মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট রাবার ড্যাম। ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি এর কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ২৮ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে উপজেলার বোগলা ইউনিয়নের বোগলা, রায়নগর, সোনাচড়া, আন্দাইরগাঁও, চান্দেরঘাট, মোল্লাপাড়া, নোয়াগাঁও, বালিচড়া, ক্যাম্পেরঘাট, আলমখালী, তেরাকড়ি এবং বাংলাবাজার ইউনিয়নের পুরান বাঁশতলা, চিলাইপাড়, চৌধুরীপাড়া, রাঙ্গাউটি, কলাউড়া, ডালিয়া, কুশিউড়া, বাইমেরবন্দ, উরুরগাঁও এবং বাওয়ালীপাড়া গ্রামের দুই হাজার কৃষকের চার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আসবে। এসব জমিতে এক লাখ মেট্রিকটন ধান উৎপাদন করা সম্ভব হবে। ড্যামের কাজের মধ্যে রয়েছে মাটি খনন, সিট পাইল ড্রাইভিং, বালি ভরাট, রাবার ড্যামের বেইজ নির্মাণ, উইয়িং ওয়াল নির্মাণ, রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ, রাবার ব্যাগ ফিটিং, ফুটব্রিজ নির্মাণ, ব্লক নির্মাণ ও স্থাপন, পাম্প হাউজ নির্মাণ, গভীর নলকূপ স্থাপন, ডব্লিউএমসিএ অফিস বিল্ডিং নির্মাণ প্রভৃতি।
চিলাইপাড় গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আগে এলাকায় সেচের অভাবে একটি ফসল হতো। রাবার ড্যাম নির্মাণ হলে তিনটি ফসল করা যাবে।’
ক্যাম্পেরঘাট গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম জানান, এটি হলে সোনাচরা হাওর, গৌরিপুর হাওর, রামনগর হাওর, তেড়াকুড়ি হাওর, আলগড়া হাওরের চার হাজার ৫০০ একর জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে। এতে কৃষকরা দুই-তিনটি করে ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।
বালিচড়া গ্রামের তাসলিম জানান, আগে তারা জমিতে শুধু অগ্রহায়ণ মাসে ফসল ফলাতে পারতেন, বোরো আবাদ করতে পারতেন না। এখন দুই ফসল করা যাবে।
কান্দাগাঁও গ্রামের আব্দুস সেবাহান জানান, আগে জমিতে পানি সেচ দেওয়ার অভাবে বোরো ধান রোপন করতে পারতেন না। রাবার ড্যাম নির্মিত হলে তাদের জমিতে আমন ও বোরো ধান রোপন করা যাবে। এছাড়া শীতকালীন সবজিও আবাদ করা যাবে।
বোগলা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া বলেন, ‘এলাকার অধিকাংশ মানুষ গরিব। কৃষি তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। রাবার ড্যাম চালু হলে ফসলের উৎপাদন দ্বিগুন হবে। এলাকার কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িতদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে।’
৮নং বোগলা বাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুল ইসলাম জুয়েল বলেন,‘বিএডিসি তাদের এলাকায় যে রাবার ড্যাম স্থাপন করছে, এর ফলে এলাকার এক ফসলি জমিগুলো দুই ফসলি হয়ে যাবে। অন্যদিকে, পানির অভাবে যেসব কৃষক শীতকালীন সবজি আবাদ করতে পারছিলেন না তারা ধান উৎপাদনের পাশাপাশি শীতকালীন সবজি উৎপাদন করতে পারবেন।’ বিএডিসির প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে এলাকায় কৃষিবিপ্লব ঘটবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)’র সহকারী প্রকৌশলী হুসাইন মুহাম্মদ খালেদুজ্জামান বলেন, ‘কৃষির উৎপাদন বাড়ানোর জন্য রাবার ড্যাম তৈরি করা হচ্ছে। এটি নির্মাণ করা হলে এলাকার চার হাজার একর জমি সেচের আওতায় আসবে। কৃষকরা ১০ হাজার মেট্রিকটন বোরো ধান অতিরিক্ত উৎপাদন করতে পারবেন।’ আগামী এপ্রিলেই ড্যামের কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করা যাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, প্রকল্পের নির্মাণ উপকরণ ও অন্যান্য সামগ্রী বারবার পরীক্ষা করাসহ কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেছেন। এছাড়া একজন প্রকল্প ইঞ্জিনিয়ার সবসময় কাজ তদারকি করছেন। ফলে অনিয়ম বা নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের কোনও সুযোগ নেই। তবে কিছু সংখ্যক ব্যক্তি তাদের স্বার্থহানির কারণে অনবরত সরকারের বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করে যাচ্ছেন।








